ঝড়ের গতিতে ড্রাইভ করছিল সুদীপ্ত। শীতের গভীর রাত। শুনশান রাস্তা। এমনিতেই দেরিটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। অনেকদিন পর সোমক জার্মানী থেকে ফিরেছে কিছুদিনের ছুটিতে। এদিকে তৃণার পিএইচডি'র ফাইন্যাল থিসিসটাও উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, ডিগ্রিটার অপেক্ষা শুধু।
সময় যখন ভালো হয় তখন সব দিক থেকেই ভালো হয় বোধহয়!
তৃণার এনজিওর আর্থিক সমস্যার জটিলতাটাও মনে হয় কাটতে চলেছে শিগগিরিই। একটা বিদেশী সংস্থা আর্থিক সহায়তা করার পাকাপাকি কথা দিয়েছে।
প্রাণের অধিক অনাথ আশ্রমকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন তার।
ফুরফুরে মেজাজে আজ আড্ডার মজলিস একেবারে জমে গেছিল বিদেশী স্কচ্-এর সঙ্গে।
বেশ অনেকগুলো দিন বাদে সবার দেখা, গল্পে আড্ডায় সময় যে কখন বয়ে গেছে টেরই পায়নি। এমনিতেই পুলিশের চাকরি, লাইফ বলে তো কিছুই নেই, যেন ঠগ বাছতেই জীবন(গাঁ) উজাড়!
ডিসেম্বরের কুয়াশা ঘেরা রাত। জমিয়ে পড়া ঠান্ডায় হাইওয়েতে গাড়ির হেড লাইটের আলোটুকুই ভরসা। সেভাবে আর কোনো গাড়িও তেমন চোখে পড়ছে না এখন, মাল বোঝাই কিছু ট্রলার ছাড়া। কুয়াশা এত ঘন হয়ে উঠছিল যে ওয়াইপারটা চালাতে হচ্ছিল বার বার। সময় যত পেরোচ্ছে ভেতরে ভেতরে চাপা একটা টেনশন বাড়ছে। মায়ের কাছে ধরা পড়ে গেলেই কেলেঙ্কারী, তাই যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছতে হবে। কর্মক্ষেত্রে যতই দোর্দণ্ডপ্রতাপ আইপিএস অফিসার হোক না কেন মায়ের কাছে তো এখনও সেই ছোট্ট দীপুই। এই বয়সেও কানমলা খেতে হয় সময় সময়। পা সোজা রেখে বাড়ি ঢুকতে না পারলে কপালে যে কি বিপদ! রক্ষে থাকবে না তাহলে আর।
এসব চিন্তায় নেশা যেন কিছুটা উবে যাচ্ছিল। তার ওপর পুলিশের আবার এক রোগ নেশা করেও যেন নেশা হয় না। সারাক্ষণ চোখ কান খোলা রাখতে রাখতে নেশার ঘোর আর জিইয়ে রাখা যায় না।
তবে অনেক দিন পর সুখকর পরিস্থিতে মেজাজটা আজ বেশ ফুরফুরে।
আসতে করে চালাল রশিদ খার 'আও গে যব তুম সজনা... অঙ্গনা ফুল খিলেঙ্গে' তৃণা তো এভাবেই ওর জীবনকে ভরিয়ে তুলবে!
এবারে পিএইচডি'র ডিগ্রিটা হাতে পেলেই বিয়ের তারিখটা ফাইনাল করে ফেলবে দু'বাড়ির তরফ থেকে।
সময়ের সাথে সাথে কুয়াশা যেন জমাট বাঁধছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু কুয়াশা যতই অন্ধকারকে ঘন করার চেষ্টা করুক না কেন শুক্লপক্ষের চতুর্দশীর জ্যোৎস্না তাকে ব্যঙ্গ করে খানখান করে দিচ্ছিল। সমগ্র প্রকৃতিকে আলোকিত করার গুরুদায়িত্ব যেন তার একার কাঁধে। চুঁইয়ে পড়া জ্যোৎস্নালোক আর গানের মিঠাস সুরে নিঃশব্দ রাতের প্রকৃতি মোহময়ীর লাস্যে রহস্যময় হয়ে উঠছিল ক্রমশ। হঠাৎই হেড লাইটের আলোতে রাস্তার ধারে হাল্কা ঝোপটাতে চোখ গিয়ে ঠেকল।
কিছু যেন একটা মনে হচ্ছে!
কোনও মানুষ নয়তো?
কাছে গিয়ে হেড লাইটের আলোতে ভালো করে দেখে নিয়ে অবাক হলো সুদীপ্ত।
কে বা কারা এই কাজ করলো?
এদিক ওদিক ভালো করে তাকিয়ে দেখলো, কোনো জনমনিষ্যি চোখে পড়ল না।
শুধু ঝোপের মাঝে পড়ে আছে একটি মেয়ের দেহ। অল্প বয়স, বীভৎসভাবে জখম। অভিজ্ঞতায় বুঝল, কয়েকজন মিলে বিশ্রীভাবে রেপ করে মেয়েটিকে ক্ষতবিক্ষত করে মেরে ফেলারও চেষ্টা করেছে হয়তো। কিন্তু এখনও শ্বাস চলছে খুব ধীরে। বেঁচে আছে যখন, তখন আর এক মুহূর্তও দেরি না করে হাতে গ্লাভস জড়িয়ে পেছনের সিটে মেয়েটিকে তুলে গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা হাসপাতালের দিকে রওনা দিল সুদীপ্ত।
মেয়েটি এতটাই জখম হয়েছে যে বাঁচবে কিনা সন্দেহ। সুদীপ্ত কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানতে পারল বাঁচার আশা ক্ষীণ তবে তারা খুব চেষ্টা করছে ভিক্টিমের জ্ঞান ফেরানোর। পরের দিন ডিউটি আওয়ার্সে আসবে বলে বাড়ির দিকে রওনা দিল।
গাড়িতে স্টার্ট দিতেই তৃণার ফোন। বাড়িতে ঠিকমতো পৌঁছেছে কিনা? হবু স্ত্রীর উৎকণ্ঠার কারণ বুঝতে পারে সুদীপ্ত।
পরেরদিন দুপুরের দিকে মেয়েটির জ্ঞান ফিরলেও কথা বলার মতো অবস্থায় আসেনি তখনও। এতটাই জখম হয়েছে যে বেঁচে ওঠাটাই একটা অসম্ভব ব্যাপার ছিল।
মেয়েটির মুখখানিতে অদ্ভুত এক সারল্য মাখা লাবণ্য। গায়ের রংটা চাপা হলেও শরীরের গঠন বেশ দোহারা ছিপছিপে। পরনে একটা সালোয়ার ছিল কিন্তু নির্মম অত্যাচারে সেটা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছিল শরীর থেকে।
মেয়েটিকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে ওর বাঁ হাতের বাহুতে চোখটা আটকে গেল সুদীপ্তর। একটা উদীয়মান সূর্যের উলকি! এরকম উলকি করার চল কোথায় যেন আছে দেখেছেও হয়তো কখনও কিন্তু এখন সেটা ঠিক মনে করতে পারছে না। যাইহোক, মেয়েটির সাথে কথা না বলা পর্যন্ত, আর ফরেনসিক রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কিছুই সামনে আসবে না।
কথা বলার অবস্থায় আসতে দুটো দিন লেগে গেল।
দিন দুয়েক পর ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে মেয়েটির জবানবন্দি থেকে যেটা জানা গেল, ওর নাম মৈথিলী।
মাসখানেক আগে মিথ্যে ভালোবাসার ফাঁদে পা দিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিল সেই ভালোবাসার মানুষটির সাথে, স্বপ্নের ঘর বাঁধবে বলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিণতি যে এমনটা হবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি সেকথা!
মৈথিলী ক্লাস টেন অবধি পড়াশুনাও করেছে। কিন্তু ওদের গ্রামে আদিবাসীদের মধ্যে মেয়েদের আর বেশি পড়াশুনা করানো হয় না তার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় পনেরো-ষোলো বছর বয়সের মধ্যে। ওর ক্ষেত্রেও সেরকমটাই হচ্ছিল। তাই নিরুপায় হয়ে পালানোর পথ বেছে নিয়েছিল। না বুঝে ছেলেটির পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছিল।
ওদের পরিবারটি ঝাড়খণ্ড-এর মাহের উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত একটি পরিবার। সেখানকার আদিবাসীদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত একটি পরিবার।
জমি জায়গা চাষবাস জীবিকা হলেও এর বাবা ঠাকুরদারা গাঁয়ের মোড়ল গোছের ব্যক্তি। ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মেয়েদের ঋতুমতি হওয়ার কালকে খুব পবিত্র মনে করে এই বিশেষ সম্প্রদায়ের লোকজন। এদের পরিবারের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ঋতুমতি হওয়ার পর মেয়েদের বাম হাতের বাহুতে এঁকে দেওয়া হয় এই উদীয়মান সূর্যের উলকি - যা শক্তি ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই উলকিকে পোশাকের আড়ালে গোপন রাখারই নিয়ম ওদের।
ওর সেই তথাকথিত প্রেমিক ওকে এখানে এনে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল । এই মতলব ও বুঝে ফেলে। তাই মৈথিলী পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এদের বিস্তৃত চক্রের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি আর। এই নরপিশাচগুলো ওকে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়, মৃত ভেবে ফেলে যায় ওই ঝোপে!
মৈথিলির দু'চোখ ভরা জল কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছিল ওর মাথার বালিশ; ল্যাক্রিমাস গ্রন্থি অশ্রু আবেগে ভেসে যাচ্ছিল।
সুদীপ্তর মন ভারী হয়ে উঠছিল।
মৈথিলীকে কথা দিল এদেরকে শাস্তি দিয়েই সে ছাড়বে।
কেসের ফাইল ঘাটতে ঘাটতে একটি নারী পাঁচার চক্রের নাম উঠে এলো। বছর দুয়েক আগে এদের কিছু ধরপাকড়ও হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
কিন্তু এবারে আর কোনো ছাড়াছাড়ি নেই, দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো সুদীপ্ত। এই চক্রের জাল ছিঁড়ে তবেই সে ক্ষান্ত হবে। এর জন্য যত দূর যেতে হয় সে যাবে।
ইতিমধ্যে মৈথিলীর বাড়িতে যোগাযোগ করা হয়েছিল তার খবর জানিয়ে। কিন্তু গ্রাম্য লোকসমাজের সংকীর্ণ মানসিকতা তাকে তার নিজের ঘরে ফিরতে দেয়নি।
তৃণার অনাথ শিশুরাই এখন তার সবচেয়ে আপনজন। সেই অনাথ আশ্রমই তার স্নেহ-মমতার এক পবিত্র ভালোবাসার নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
অতীতকে বিস্মৃত হতে চায় মৈথিলী। যে অতীত তার কথা ভাবেনি একবারও। লোকসমাজের জন্য তাকে আশ্রয়চ্যুত করে দিতেও দ্বিধাবোধ করেনি একবারের জন্য। সেই অতীতকে মনে রেখে কী লাভ? কিন্তু তার হাতের উলকিটি?
যাকে সে মুছতে চাইলেও মুছতে পারবে না কোনোদিন। যে আজীবন তার অতীতের চিহ্ন বয়ে বেড়াবে; মনে করিয়ে দেবে গ্রাম্য শৈশব কৈশোরের কথা, তার পরিবারের কাছের মানুষগুলির কথা...!
শীতের একটি বিভীষিকাময় রাত আজীবনের মতো বদলে দিল তার জীবনের স্বাভাবিক ছন্দকে। রুক্ষ শুষ্ক শীতের শীতল কাঠিন্য তার সমস্ত আবেগ উচ্ছাসকে বরফ চাপা দিয়ে গেছে নিষ্ঠুর এক কুৎসিত অন্ধকারে।
স্বজন অপরিগৃহীত মৈথিলী তবু বাঁচবে সব প্রতিকূলতাকে জয় করে; সব দুঃখ-বিষাদকে পেছনে ফেলে নতুন সম্পর্কের বাঁধনে; সমাজে অস্বীকৃত নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্বর্গীয় আনন্দে।
বিপরীতমুখী অভিজ্ঞতা পরিণত করে তুলেছে এই বয়সেই। পুড়িয়ে খাঁটি করে তুলেছে তাকে।
সমাজের দুই শ্রেণীর মানুষকে প্রত্যক্ষ করেছে সে, এক অমানবিক কদর্যতা আর দুই - মানুষরূপী ভগবান! তাঁদেরই সাহচর্যে দুঃস্বপ্নকে ভুলে এগিয়ে যাবে জীবনের নতুন গতিপথে।
