সতেরো হাজার থেকে সরল বঙ্কিম পথে চার হাজার ফুট নেমে তেরো হাজারি তাওয়াং'এ থিতু হতে অনেকটাই সময় লেগেছে। যখন পথের ঘূর্ণিপাকে কখনো ডাইনে কখনো বাঁয়ে উল্টোদিকের পাহাড়ের উপত্যকার অনেকটা জায়গা জুড়ে আকাশের তারারা দৃষ্টিগোচর হয়, বুঝতে পারি "এখন আর দেরি নয় 'নামবো' ত্বরা..."
অদ্ভুত পথের শেষ অংশ। উপত্যকার আলোগুলো ছড়ানো ছিটানো। বেশ খানিকটা জুড়ে আলো, তারপরেই আঁধার। ফের আলো ফের অন্ধকার। অনেকটা জায়গা জুড়ে ঘর-বাড়ি-দোকান'এর মধ্য দিয়ে চলতে চলতে যেই মনে হয় এই এসে গেলাম, অমনি'ই ওইসব ঘরবাড়ি অদৃশ্য। ফের অনেকটা পথ নির্জন জঙ্গলে ভরা।... আবার বাড়ি ঘর, আলো ফের সেই জঙ্গুলে পথে চলমান গাড়ি।
কতক্ষণ, মনে নেই, কতক্ষণ ধরে এই পাহাড়ি ভুলভুলাইয়া আমাদের ক্লান্ত করে, চিন্তাভাবনাকে অবশ করে রেখেছিল।... অবশেষে ঢুকলাম তো তাওয়াং শহরের কেন্দ্রে; কিন্তু বেশ কিছু কহতব্য ঘটনার পরে। প্রথমে পেট্রোল পাম্পের পাঁচিল ভাঙা (ভুল করে এর আগে এই ভাঙাটার উল্লেখ করেছিলাম বমডিলার প্রবেশপ্রান্তে।) তারপর, ড্রাইভার পথনির্দেশ বুঝতে না পেরে হোটেলের এক-দেড়শো মিটারের মধ্যে গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খেতে খেতে শেষে ধাক্কা দিলো আরেক গাড়িকে। ম্যানেজার ফোন ধরছে না।... ক্রুদ্ধ যাত্রীদের বিস্তর গালমন্দের পর কেমন করে যেন গাড়ি পৌঁছালো হোটেলের দোড়গোড়ায়। সেখানে আরেক প্রস্থ তীব্রতর বিতন্ডা। দ্বিধাবিভক্ত ওই হোটেলের নির্মাণশৈলী। ঘর নির্বাচনে আরেক প্রস্থ অনিশ্চয়তা। অন্য হোটেলের খোঁজে বেড়িয়ে বিফল হল আমাদের পরিবারের তিন তরুণ তুর্কী।
একটা আয়তাকার প্রাঙ্গণের প্রস্থ বরাবর দু'দিকে পাঁচিল। দৈর্ঘ্যের দিকে মুখোমুখি দুটো বিল্ডিং। একটার একপাশের কোণ থেকে সিঁড়ি উঠেছে। আরেকটার বুকের থেকে গন্ডারের শিং-এর মতো বেরিয়ে বিল্ডিংয়ের বাইরে থেকে সিঁড়ি উঠেছে। পরে এই এটাতেই সর্বোচ্চ তলে পাশাপাশি ঘর জুটেছে আমার আর তাপসের।
সকালের চা সক্কালবেলা বেল টিপে ঘরে দিয়ে যায়। জলখাবার, লাঞ্চ (দিনমানে হোটেলে থাকলে), বিকেলের হালকা কিছু খাবার, রাতের খাবার এসবের জন্য চারতলা সিঁড়ি ভেঙে নেমে উল্টোদিকের বিল্ডিংয়ের চারতলায় ওঠা; ফিরতি পরিক্রমাও তেমনই।
আমাদের তিন পরিবারের তিন জোয়ান আগের রাতে যা পরাক্রম দেখিয়েছিল, তার জেরে ট্যুর কোম্পানির লোকজন বিনা বাক্যব্যয়ে আমাদের এই দুই বুড়োবুড়িকে রেহাই দিয়েছিল ওই ব্যায়াম করা থেকে; খাবার ঘরেই পৌঁছিয়ে দিত তাওয়াং-এর তিন রাত্তির।
পরের দিন সকালটা বিশ্রাম। দুপুরের আহারান্তে বেরিয়ে প্রথমে নিয়ে গেল তাওয়াং মনাস্টেরী।

তাওয়াং মনাস্টেরী'টির একাংশ।
অরুণাচলের পশ্চিমপ্রান্তের এই বৃহদাকার মনাস্টেরীটি দেশের প্রাচীনতম মনাস্টেরীগুলির অন্যতম। পঞ্চম দলাই লামার ইচ্ছানুসারে এটি নির্মিত হয়। প্রায় হাজার ফুট পাঁচিল ঘেরা ত্রিতল এই মনাস্টেরীতে বজ্রযান-পন্থী বৌদ্ধদর্শনের চর্চা হয়। এটির গ্রন্থাগারেও উক্ত-বিষয়ক অনেক দুষ্প্রাপ্য পুঁথির সম্ভার রয়েছে। মনাস্টেরীর মধ্যে ৬৫টি বাসভবন রয়েছে। ঘরবাড়ি সহ তাওয়াং উপত্যকার অনেকটা জায়গা দৃশ্যমান হয় এখানটা থেকে।

মনাস্টেরী'র একপ্রান্ত থেকে তাওয়াং শহরের একাংশ।
মনাস্টেরী থেকে বেরোতে বেরোতে বিকেল...
তাওয়াং মনাস্টেরী থেকে বেরিয়ে আর একটি ছোট জায়গায় গাড়ি দাঁড়ালো। একটা টিলা-মতো জায়গার উপরে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের সুবর্ণরঙা মূর্তি। সামনের চাতালে কয়েকজন যুবক যুবতী নাচে গানে বুদ্ধের উদ্দেশ্যে তাদের ভালোবাসা, প্রাণের আর্তি নিবেদন করছে। তাপসের মেয়ে, নাতনীও জুড়ে গেল নৃত্যরতাদের সাথে।
একটু বিশ্রাম। তারপরেই আবার চলা। এবারে গন্তব্য শহরের আরেক প্রান্তে, আরেক উপত্যকায়। সেখানে দ্রষ্টব্য: War Memorial, Defence Museum. কেউ কেউ দেখলো বাকি কেউ কেউ দাঁড়িয়ে ঘুরে ফিরে কুয়াশা মাখা পাহাড়ের 'অদ্ভুত আঁধার' নিরিক্ষণ করতে থাকলো। এরপর একটু উপরে উঠে দেখার ছিল প্রথমে, ভালুক, মোষ, ইত্যাদির রূপসজ্জায় স্থানীয় নৃত্যের উপস্থাপনা। তারপর Light and Sound-এ '৬২'র যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অসীম কৃতিত্ব; ফাঁকে ফাঁকে জুড়ে দেওয়া সমকালীন রাজনৈতিক ঘটনাবলী।
এসবের পরে হোটেলে ফিরে আসা।
কাল ঘুরতে যাওয়া হবে বুম-লা ভারত আর চীনের সীমানারেখার কাছে...
আজ সকালে রওয়ানা হয়ে যাওয়া হবে বুম লা (তিব্বতি ভাষায় 'লা' মানে মাউন্টেইন পাস বা গিরিপথ)। তাওয়াং শহর থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে এই স্থানটিতে বড় গাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে না, তাই ছয়টি ছয় আসনের গাড়ি হোটেল থেকেই ব্যবস্থা করে দিয়েছিল আগেই রাতেই। ইনার লাইন পারমিট থাকলেও নতুন করে হোটেলে আধার কার্ডের প্রতিলিপি দিতে হয়েছিল। এইসব গাড়ির ভাড়া পর্যটকদের আলাদা করে দিতে হয়।
তাওয়াং শহর ছাড়াতেই বাড়ি ঘরদোর ভ্যানিশ। সরু রাস্তা; গাছপালা উচ্চতার সাথে সাথে হ্রস্বাকার হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেল। কিছুদূর অন্তর সেনাবাহিনীর নানান ঘাঁটি, কর্মকেন্দ্র। পথের দু'পাশের উপত্যকা জুড়ে শুধুই পাথর নানা আকারের। যেন এক শিলাসমুদ্রের বুকে দুলতে দুলতে আমাদের বাহনগুলি পাড়ি দিচ্ছে চীন-ভারত দুই দেশের সীমানার উদ্দেশ্যে।
মাঝপথে অন্য রাস্তা ধরে গাড়ি চললো এক হ্রদের অভিমুখে।
সুঙ্গাৎসার (Sungatsar) নামে এই হ্রদের পরিচিতি অবশ্য এক হিন্দি ছবির নায়িকার নামে 'মাধুরী হ্রদ'; উনি কোন এক চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সূত্রে এই হ্রদের পাড়ে নেচেছিলেন।

বাষট্টির যুদ্ধ খ্যাত 'বুম-লা' যাওয়ার পথে পড়ে এই হ্রদ, অভিনেত্রী'র নৃত্যের সুবাদে পর্যটকদের কাছে এর পরিচিতি 'মাধুরী লেক' হিসাবে।
কিছুক্ষণ ওই হ্রদের ধারে থেকে ফের গাড়ি ছুটলো বুম লা'র দিকে।
দুই জায়গাতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে আমি আর তাপস গাড়িরাভ্যন্তরে থাকাই শ্রেয় বিবেচনা করলাম।
গাড়ির আর তিন সহযাত্রী ফার্লং দুই হেঁটে দেখে এল 'সীমানা'।
১৫,২০০ ফুট উচ্চতা বুম লা'র। সঙ্গে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। শীত যেন জামাকাপড় ভেদ করে শরীরকে অসহনীয় শীতলতায় মুড়ে দিচ্ছিল।
যা হোক, ফিরে তো আসা হলো তাওয়াং-এ। অতসব করে লাঞ্চ সন্ধ্যের মুখে।
একটু ঘুরে বেড়ানো তাওয়াং-এর বাজারে শেষের প্রহর পূর্ণ করা (অর্থাৎ মহিলাদের যৎ যৎ স্থানে কেনাকাটার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া)'র তাগিদে।
আগামীকাল থেকে শুরু হবে "আমরা যথা হৈতে আগমন করি, তথায় প্রত্যাগমন করি"-র পালা।...
ফিরে আসার প্রথমদিন আমাদের গন্তব্য দিরাং।
তাওয়াং থেকে নিঝুম প্রকৃতির সেলা নয়, ভিন্নপথে মানবসভ্যতার উদ্ধত জয়োল্লাসের মতো এক টানেলের মধ্যে যখন ঢুকলাম, মনে হল কোথায় মুক্ত আকাশ, সবুজ অরণ্য, গগনচুম্বী পর্বতশিখর; আর কোথায় আলো ঝলমলে এক গর্বিত আস্ফালন!
ভাগ্যিস খুব স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছিল ওই টানেল তাই আরো আকাশ আরো বাতাস অচিরেই লিখে দিল গিরিরাজের অপূর্ব সৌন্দর্যের বার্তা।
আমাদের এই বেড়ানোর সময়টায় প্রায়শঃই আকাশ মেঘে ঢেকে যেত, আস্তে জোরে বৃষ্টি নামতো; পরক্ষণেই ফের রোদ উঠত ঝকমকিয়ে।
আমাদের, সমতলের বাসিন্দাদের কাছে বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয় কালো মেঘের ঘনঘটা। এত উঁচুর পাহাড়ে সাদা মেঘেই বৃষ্টির আগমন ঘটে। তেমনই উপত্যকার ঢেউ-খেলানো সবুজের গালিচায় সূর্যালোকের ঠিকরে আসা দেখতে দেখতেই যখন একটা জলপ্রপাতের (Snake Falls) কাছে এলাম, তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। তারমধ্যেই নেমে ঝর্ণা দেখতে যাওয়ার ব্যাগ্রতা। একরাশ ঘন চুলের মতো শ্বেতশুভ্র ওই প্রপাত সটান নেমে এসেছে পায়ের কাছে, একটা কুন্ডের মতো জলরাশিতে মিলিত হতে।
বৃষ্টির কারণে স্বল্পস্থায়ী হল এই দর্শন।
আবার চলা। অরুণাচলের এইসব বনভূমি খুবই নয়নাভিরাম। গাড়োয়াল, হিমাচল, সিকিমের মতো বন কেটে বসত, থুড়ি, রিসর্টের বর্বর লোভ স্পর্শ করেনি এখানকার ভূপ্রকৃতিকে।
তাওয়াং থেকে দিরাং'এর দূরত্ব ১৩২ কিলোমিটার। জাতীয় সড়ক (১৩ নং) ধরে তিরিশ কিলোমিটার যেতে জং (Jung) নামে একটা ছোট্ট শহর পড়ে। সেখান থেকে Jung Falls Road ধরে দুই কিলোমিটার গিয়ে পৌঁছাতে হয় ওই জলপ্রপাতের পায়ের কাছে। পৌঁছালাম।
তারপরেই বাকরোধ হয়ে এল...
গাড়ি যেখানে নামিয়ে দিল, ঢালু পথ বেয়ে একটু নীচে নামতে একটা ছোট চাতাল। সেখান থেকে একটা ছোট ট্রেক রুট প্যাঁচ খেয়ে নেমেছে অনেকটা নীচে তাওয়াং নদীর তটে। দু'পাশে উঁচু পাহাড়ের মাঝে খরস্রোতা নদী বয়ে চলেছে। একপাশের পাহাড়-শীর্ষ থেকে বিপুল জলরাশি নিয়ে নদীবক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছে জং জলপ্রপাত। একে নুরানাং ফলস্'ও বলে; কারণ, সে লা'র উত্তরদিকের আনত ঢাল বেয়ে বয়ে এসে নুরানাং নদী তার পুরো শরীরটা নিয়ে মিলিত হয়েছে নীচের ওই নদীতে।
জব্বলপুরের ধুয়াধার প্রপাতে দেখেছি পুরো একটা নদী (নর্মদা) কিভাবে নীচে পতিত হয়; কিন্তু এখানকার এই প্রপাতের কাছে সে নিতান্ত'ই শিশু। ধুয়াধারে নর্মদা পড়েছে তিরিশ মিটার নীচে এখানে এই পার্বত্য-স্রোতস্বিনী দূর্বার গতিতে নামছে একশো মিটার উঁচু শিখর থেকে। অসমান, উঁচিয়ে থাকা শিলাখন্ডে ধাক্কা খেয়ে, যেন রুষে উঠে, চতুর্দিকে জলরাশি বিকীর্ণ করে, প্রকান্ড ঢেউ'এর মতো নিজেকে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ব্যাপ্ত করে নেমে আসছে অপরিমেয় জলরাশি।
যেখানেই বাঁধা পাচ্ছে, সেখানেই সাদা মেঘের মতো আকাশকে, গাছপালাকে আবৃত করে উড়ন্ত জলকণা আশপাশের প্রকৃতিকে সিক্ত করে রেখেছে। জং, নুরানাং এসব ভ্রমণকাহিনীর পরিচিতি। স্থানীয়রা একে 'বং বং' নামে ডাকে।

'সে-লা'র উত্তরের ঢাল থেকে বয়ে আসা এক নদী তার সমস্ত শরীর নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে একশো মিটার নীচে আরেক বহমান নদীতে। একসময় ভুটানকে একটু ছুঁয়ে এই বিপুল জলরাশি আবার এসে মিলবে ব্রহ্মপুত্রের শরীরে।
আবিষ্ট করে রাখে এই জলপ্রপাতের অপরূপ সৌন্দর্য। দুই পাহাড়ের মাঝে তীব্র ধারায় বয়ে চলা তাওয়াং নদীর সাথে এর সঙ্গম, ভয়ঙ্কর শব্দ, নিয়ে দর্শকদের নিয়ে যায় এক অচিন জগতে।
জলপ্রপাতের একটু উপরেই 'নুরানাং হাইডেল প্রোজেক্ট' প্রকৃতির শক্তি থেকে যতটা শক্তি মানুষ শুষে নিতে পারে, যেন তার'ই এক উৎকট নিদর্শন।
আবার শুরু চলা। বাকি পথ অতিক্রম করতে আবার একটা ধ্বস নামা, ধ্বস সরানোর পরিচিত দৃশ্য।
দুপুরের খাওয়াও হল সেখানেই, যেখানে যাবারবেলায় খাওয়া হয়েছিল।
বিকেল আর সন্ধ্যার সন্ধিক্ষণে পৌঁছালাম দারিং।
দুই দিকের পাহাড়ের আনত উপত্যকা নেমে এসেছে যেখানে সেই মিলনস্থল দিয়ে বয়ে চলেছে দিরাং চু নদী।
এর একপাশে ছোট ছিমছাম দিরাং শহর। প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোরম। কিছু দর্শনীয় জায়গা থাকলেও সময়ের অপ্রতুলতায় আমাদের প্রায় কিছুই দেখা হয়ে ওঠেনি।
পাহাড়ের বেশ খানিকটা উঁচুতে এক মনাস্টেরীর আশপাশে ঘুরেই আমাদের দিরাং পর্ব শেষ।
রাত শেষ হলে নেমে যাব পাহাড়ের সান্নিধ্য ছেড়ে সমতল ভালুকপং-এ।
ঠিক মনে নেই দিরাং ছেড়ে ভালুকপং যাওয়ার শুরুতে, নাকি ভালুকপং ছেড়ে আসামে কাজিরাঙায় যাওয়ার প্রাক্কালে, আমাদের নিয়ে গেছিল বড় একটা অর্কিডেরিয়ামে। বটানী'র 'ব অক্ষর গোমাংস' বিবেচনা হেতু আমাদের সেখানে ঘুরে ঘুরে অপরিচিত উদ্ভিদগুলো দেখে দেখে "বাহ্ কি সুন্দর!", "দারুণ, না!" এইসব স্বগোতক্তি করেই সময় কেটেছিল।
এরপর, সোজা কাজিরাঙায় চলে যেতেই পারি; কিন্তু ওই যে ভালুকপং'এর নৈশাবাস আর সেই আবাসে নিশিযাপন, সে ব্যাপারে কিছু না লিখলে যে সহযাত্রী, আর এই ভ্রমণ-বেতান্ত'র সহপাঠী দুইয়ের'ই প্রতি অবিচার করা হবে।
তাই... রাই ধৈর্যং।
ভালুকপঙের হোটেলটি অনেকটা জায়গা জুড়ে, অনেকগুলো ঘর; কিন্তু সবটাই কেমন বেখাপ্পা রকমের নির্জন। আবাসিক যেমন কেউ ছিল না, হোটেলের কর্মচারী'ও তেমনি মোটে দুই কমবয়সী মহিলা।
বিদ্যুৎ-সংযোগ বোধহয় বেআইনী ভাবে নেওয়া সন্ধ্যের পর থেকেই আলো আসছিল আর চলে যাচ্ছিল। বাথরুমে ব্যবস্থা ঠিক, কিন্তু জানালার পাল্লা ভাঙা। বাইরে থেকে ছিটকিনি'ও কোথাও লাগছে, কোনো ঘরে লাগছে না।
মোমবাতি চেয়েচিন্তে নেওয়া গেলেও দেশলাই নেই।
সবমিলিয়ে একটা ভুতুড়ে পরিমন্ডল। এরই মধ্যে তাপসদের ঘরে তিন পরিবারের সদস্যরা মিলে ভূতের গপ্পোতে মশগুল হয়ে সময় কাটাতে শুরু করলো।
সব রাত শেষ হয়, যেমন, সব পাখি ঘরে ফেরে। আমরাও ঘরে ফেরার শেষ পর্যায়ে পরদিন বিকেলে কাজিরাঙায় এলাম।
এখানকার হোটেল বেশ পরিচ্ছন্ন।
সন্ধ্যেয় গেলাম একটা গানবাজনার অনুষ্ঠানে। আসামের অনেক উপজাতি সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হ'ওয়া গেল ওদের পরিবেশিত লোকনৃত্যের মাধ্যমে।
পরদিন ভোর ভোর ছোটগাড়ি করে জাতীয় উদ্যানের একাংশে ঘুরে গন্ডার দেখা।
সেদিনই গুয়াহাটি ফিরে সন্ধ্যার ট্রেন ধরা।
এভাবেই "আমরা যথা হইতে আসি, তথায় ফিরিয়া যাই" এই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হল।
(সমাপ্ত)
