[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]

পর্ব - ৩২
মাদারীপুর জেটি হ্যাজাকের আলোতে দিনের আলোর মতো উদ্ভাসিত।
প্রশস্ত যেটিতে সুশৃংখলভাবে অন্তত শ'দুয়েক নারী-পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে তাদের স্বাগত জানানোর জন্য। পিছনেও ঘাট থেকে বড়ো রাস্তা পর্যন্ত যতদূর চোখ যায় মশালের আলো জ্বলছে। মানুষের ভিড়।
নজরুল বেশ চমৎকৃত হলেন। আরো ভালো লাগল তাদের শৃঙ্খলা দেখে। স্টীমার এবং মানুষের কলরব - সব মিলিয়ে একটা হইচই আছে বটে, কিন্তু অযথা ছোটাছুটি নাই।
একেবারে সামনে ১০-১২ জন নারী-পুরুষ বড়ো বড়ো সাইজের গাঁদা ফুলের মালা, থালায় ধান দুর্বা চন্দন, হাতে শঙ্খ ইত্যাদি নিয়ে বরণ করার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝখানে ধুতি পাঞ্জাবিতে সুসজ্জিত সৌম্যদর্শন ব্যক্তিটিকে হেমন্ত সরকার 'প্রতাপদা, কেমন আছেন' বলে জড়িয়ে ধরায় নজরুল বুঝে গেলেন তিনি ড. প্রতাপচন্দ্র গুহ রায় কলকাতা অ্যাসেম্বলিতে বড়ো একটা পদে আছেন। কাগজে মাঝেমধ্যে নাম বের হয়। মাদারীপুর সম্মেলনের তিনি অন্যতম কান্ডারী।
জেটিতে পদার্পণের সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে শুরু হয়েছে শঙ্খ এবং উলুধ্বনি। অতিথি বরণের মধ্যেই নজরুলের বিস্ময় প্রকাশ
- এতো দেখছি বিশাল সমাবেশ! শুধু সমাবেশ নয়, শৃঙ্খলাও দেখার মতো।
প্রতাপবাবু উত্তর দিলেন, আপনাদের মত গুণীজন এবং দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দ আসছেন। আর মাদারীপুরের লোকজন তাদের বরণ করতে আসবেনা?
হেমন্ত সরকার বললেন, নেতৃবৃন্দের ব্যাপার নয় প্রতাপদা। আমি তো আগেও এসেছি, আজকের সমাবেশ কাজী নজরুল ইসলাম এবং হেমপ্রভা মজুমদারকে বরণ করার জন্য।
কটাক্ষের আঁচ পেয়ে হেমপ্রভার তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া - আমি এখানকার রোজকার মানুষ দাদা। আমাকে নতুন করে দেখবার কোন ব্যাপার নেই। আজকের ভিড় কাজী সাহেবকে দেখবার জন্য।
নজরুল কিছু বলতে যাবার আগেই অভ্যর্থনা দলের ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরল - কাজীদা!
নজরুল একটুও অবাক না হয়ে তাকে ঝাঁকুনি দিয়ে ধমকের সুরে বললেন, ব্যাটা নচ্ছার! এতোক্ষণ কোথায় ছিলি? সারা পথ পূর্ণ আর কালীর কথা ভাবতে ভাবতে আসছি - সবার সঙ্গে দেখা হবে। তা পূর্ণ কোথায়?
- পূর্ণদা আবার কোথায় যাবে? যেখানে ওর ঘরবাড়ি সেখানেই, মানে আবার জেলে গিয়েছে।
- আবার জেলে?
- কদিন আগে ফরিদপুরে সভা করছিল। সেখান থেকে পুলিশে ধরে নিয়ে গিয়েছে।
প্রতাপচন্দ্র পরিচয় করিয়ে দিলেন - আমার ভাই কালীপদ। সেই তো মাদারীপুরকে নজরুলের নামে মাতিয়ে রেখেছে। বলা ভালো তাতিয়ে রেখেছে। বহরমপুরে জেলখানায় ক'দিন ছিল। সেখান থেকে পূর্ণকে নিয়ে লেখা কাজী সাহেবের কবিতা নিয়ে এসেছিল। এখনো পূর্ণ'র পিছন পিছন ঘোরে আর সেই কবিতা শুনিয়ে বেড়ায়।
হেমপ্রভা বললেন, আমিও কালিপদর কণ্ঠে সে কবিতা শুনেছি - মাদারীপুরের মর্দবীর!, - আপনিও শুনেছেন? নজরুলের বিস্ময় প্রকাশ।
কালিপদ তাগাদা লাগালো। সেসব অনেক গল্প - পরে শোনাব, এখন চলুন বাসায় যাওয়া যাক। অনেক লোক অপেক্ষা করছে আপনাদের দেখার জন্য।
বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমিতিতে নজরুল নিজের জনপ্রিয়তা এবং মানুষের অভ্যর্থনা পেয়ে অভ্যস্ত। কিন্তু মাদারীপুর যেন অন্যরকম। সুশৃংখলভাবে দুধারে নারী-পুরুষ বড় রাস্তা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ফুলের পাপড়ি ছাড়াচ্ছেন। স্টিমারের প্রায় সকল যাত্রীই সম্মেলনের প্রতিনিধি অতিথি। কিন্তু জনতার অন্যতম লক্ষ্য যে নজরুল সেটা তিনি নিজে বুঝতে পারছেন। পাশাপাশি হেমপ্রভাকে ঘিরে ১০-১২ জন মহিলা ইতিমধ্যে একটা বৃত্ত তৈরি করে ফেলেছে। সবাই যেভাবে দিদি দিদি করে কথা বলছেন, তাতেই স্পষ্ট বোঝা যায় এই এলাকায় মহিলাদের মধ্যে হেমপ্রভার প্রভাব এবং পরিচিতি কত গভীর। মহিলাকে যতই দেখছেন নজরুলের মুগ্ধতা ও শ্রদ্ধা বাড়ছে। এইরকম মহিলা এই দেশে আরও দরকার। নিজস্ব মুসলিম সমাজের কথা, বিশেষ ভাবে মহিলাদের দুরাবস্থার চিত্র মনের মধ্যে ভেসে উঠলো। মাদারীপুর মোটামুটি ভাবে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাই বলা যায়। কিন্তু হেমপ্রভাকে ঘিরে থাকা মহিলাদের মধ্যে মুসলিম কোনো নারী আছে বলে ম্যহলোনা। ভেতরে চিনচিনে একটা যন্ত্রণা অনুভব করেন। রোকেয়া খাতুন, মাসুদা রহমানের মতো কিছু নারী এ সমাজে ঘর থেকে বেরিয়ে আসার যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। শিক্ষা সাহিত্যের মতো নিজস্ব বৃত্তে অনেক সাফল্যও পেয়েছেন, কিন্তু হেমপ্রভাদের মতো মানুষের মধ্যে যেতে পারেন নি। মুসলিম সমাজ তাঁদের অতদূর যাবার সুযোগ দেয়নি।
ডনোভান বালিকা বিদ্যালয়ে অতিথি ডেলিগেটদের থাকার জন্য ব্যবস্থা হয়েছে। এছাড়াও শহরে বিভিন্ন বাড়িতে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেকে আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। হেমন্তবাবুদের জন্য ব্যবস্থা হয়েছে স্কুলের কাছেই এক কাছারি বাড়িতে। দোতলায় বেশ কয়েকটি ঘর। মাঝখানে বারান্দাসহ একটা প্রশস্ত ফাঁকা জায়গা। নায়েব গোমস্তা বা জমিদারবাবু এলে এখানেই বোধহয় প্রজাদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করেন। আড্ডা ও আলাপ-আলোচনার সুবিধার্থে প্রায় পুরোটা ফরাস পেতে দেওয়া হয়েছে। খাওয়ার পর সেখানে বড়ো রকমের আসর। প্রতাপবাবু অভ্যর্থনা কমিটির সভাপতি, দায়িত্ব অনেক। হেমন্তবাবু মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি। আগামীকাল তাঁর ভাষণই মুখ্য হবে। আর কারা কখন বলবেন সেসব নিয়ে খসড়া করা, পরদিন ত্রিপুরা, মালদহ, বর্ধমান প্রভৃতি দূরের জেলা থেকে আগত প্রতিনিধিদের বক্তব্য ও প্রস্তাব পেশ করার সময় ও সুযোগ দিতে হবে।
হেমপ্রভা সহ উপস্থিত অনেকেই কাজী সাহেবের গান শুনতে চান। সেকথা ভেবে হারমোনিয়ামের জোগাড় রাখা হয়েছে। আগামীকাল সেটি মঞ্চেও যাবে। কী গান গাওয়া হবে সেসব নিয়ে কানাকানি আব্দারের ভিতরে ছুটতে ছুটতে এসে হুড়মুড়িয়ে হাজির হলো কালিপদ। হেমপ্রভা সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, কাজী সাহেবের গানের পরে তো আর কথা চলে না। কিন্তু আমরা কালিপদ'র কণ্ঠে কাজী সাহেবের সেই কবিতাটি শুনতে চাই, সঙ্গে গল্পটিও।
রোমহর্ষক গল্পটি মাদারীপুরের মানুষ প্রায় সবাই জানে। কিন্তু দূরের অতিথিদের বেশি কারো জানা ছিল না। জানার কথাও নয়। বহরমপুর জেলে নজরুল পেয়েছিলেন পূর্ণচন্দ্রকে - চোদ্দ বছর বয়সেই মাদারীপুরে বিপ্লবী সমিতি গড়ে নেতৃত্ব দিয়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। একাধিক জেলফেরতা হয়ে বহরমপুরে। তখন মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে। বেরিয়ে মাদারীপুরে একটা চারণদল তৈরি করবে বলে নজরুলকে ধরল একটা নাটক লিখে দিতে হবে। সে নাটক লেখা হলো। পূর্ণ কায়দা-কৌশল করে বাইরে নিয়েও এসেছিল। কিন্তু পথে সে পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়। শুধু 'জাতের নামে বজ্জাতি' গানটি পূর্ণ মুখস্থ করে ফেলেছিল বলে উদ্ধার হয়।
এদিকে দিল্লিতে কংগ্রেস সম্মেলন থেকে ফেরার পথে তিনদিনের জন্য বহরমপুর বেড়াতে এসে পুলিশের খপ্পরে পড়ে জেলখানায়। পূর্ণচন্দ্রের ভক্ত। ভালোই জমল। পূর্ণচন্দ্রের মুক্তি উপলক্ষে মাদারীপুরে একটা সংবর্ধনা সভা করার ইচ্ছে - আবদার হলো নজরুলকে কবিতা লিখে দিতে হবে। নজরুল কাগজে লিখে ভাঁজ করে সেপাইদের সাহায্যে কালিপদ'র জন্য সকালের টিফিনের পাউরুটির ভিতরে ঢুকিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। কালিপদ'র কথায় - পাউরুটি ছিঁড়তেই বেরিয়ে পড়লো কাগজ - কাজীদার কবিতা! সেকি আনন্দ! বলে বোঝাতে পারব না। খাওয়া তো মাথায় উঠলো। দুদিন পরেই ছুটি। গেটে তল্লাশিতে যদি কাগজ কেড়ে নেয়! সারাদিন পড়ে মুখস্থ করে ফেললাম।
এস অষ্টমী-পূর্ণচন্দ্র!
এস পূর্ণিমা-পূর্ণচাঁদ!
ভেদ করি পুণঃ বন্ধ কারার অন্ধকারের পাষাণ-ফাঁদ!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারিপুরের মর্দবীর,
বাংলা-মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!
সেই কবিতা কতবার পাঠ করেছি মাদারীপুরে, ফরিদপুরে। গমগম করা উচ্চকণ্ঠে আবারো পাঠ হলো। শুরু হলো নজরুলের গান। বসন্ত মজুমদার প্রথমেই আব্দার জানিয়ে রাখলেন দু'খানা গানের - 'সখী, প্রতিদিন হায় এসে ফিরে যায়' এবং 'শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে'। নজরুল কিছুটা অনুমান করলেন, জিগ্যেস করলেন - এই গান আমার ছোটো বেলার প্রিয়। বসন্তবাবু বললেন, জানি তো। বাউন্ডেলে তো এই গানই গেয়েছে। নজরুল হো হো করে হেসে উঠলেন - আপনার পড়া আছে সেই কাঁচা হাতের গল্প? ভালো লাগল জেনে। হেমপ্রভা জানালেন, এ অঞ্চলে আপনার সব লেখারই অনেক পাঠক আছে। সুতরাং নিশ্চিন্তমনে আপনার পছন্দের গান শোনান। ছয়-সাত খানা রবীন্দ্রনাথের গানের পর অভয়চন্দ্র, তেহট্ট থেকে আসা প্রতিনিধি, হেমন্তদার অন্যতম সঙ্গী, আবদার - গতমাসের সম্মেলনে গাওয়া কৃষক আর শ্রমিকের গান দুটি শোনাতে হবে। ধীবর সমাজ শুনুক গানগুলি। একসময় হেমন্তদার নির্দেশে আসর ভাঙতে হলো। আগামীকাল সকাল থেকেই নানান কাজ।
স্কুলের মাঠে মঞ্চ। বিপুল জনসমাবেশ। কয়েক হাজার তো হবেই। এতো মৎস্যজীবী আছে এই এলাকায়? দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রতিনিধি আছেন অবশ্য। কিন্তু কতই বা, শ'পাঁচেক হবে। এতো মানুষের সামনে বক্তব্য রাখা যায়? ঘরের মধ্যে হলে তবু আওয়াজ পৌঁছায়। প্রতাপচন্দ্র গুহ রায় আয়োজক পক্ষের প্রধান হিসেবে জনতার উদ্দেশ্যে ভূমিকা শুরু করলে সভা ক্রমশ শান্ত এবং নিঃশব্দ হয়ে এলো। মঞ্চে উপস্থিত গুণিজনদের পরিচিতি করিয়ে দিলেন। কাজী নজরুল ইসলামের নাম উল্লেখ করতে করতালি সহযোগে প্রবল হর্ষধ্বনি ভেসে এলো। বক্তব্য নয়, শ্রোতারা তাঁর গানের অপেক্ষায় আছেন। যাইহোক, সভার উদ্দেশ্য, আগামী দুইদিনের আলোচ্যসূচির একটা রূপরেখা দিয়ে রাখলেন। কাজী সাহেবের উদবোধনী গানের পরেই প্রধান বক্তা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি হেমন্তকুমার সরকার তাঁর বক্তব্য পেশ করবেন।
নজরুল উঠে হারমোনিয়াম ধরলেন। পিন পতনের স্তব্ধতা।
শুরু করলেন কৃষ্ণনগরে সদ্যরচিত গান -
"আমরা নিচে পড়ে রইব না আর শোনরে ও ভাই জেলে
এবার উঠব রে সব ঠেলে!"
শুধু জেলেদের নিয়ে, তাদের উদ্বুদ্ধ করে এরকম গান আগে কেউ শোনায়নি। নয়খানি অন্তরার দীর্ঘ আকারের গান। প্রতিটি কথায় ধীবরদের উজ্জীবিত করার আহ্বান। সাতলক্ষ জেলের চৌদ্দলক্ষ বাহু! বিশাল শক্তি। ভয় কিসের? গানের মাঝে মাঝে কথা ছুঁড়ে দেন। মনে করিয়ে দেন - মহাভারত রচয়িতা বেদব্যাস ছিলেন মৎস্যগন্ধার পুত্র। পুরাকাল থেকেই ধীবরগণের পেশা সম্মানিত। আর একা একা খেপলা জাল ফেলা নয়, সবাই মিলে বেড় জাল দিয়ে যত অসুরদের ঘিরতে হবে, ডাঙায় এনে ফেলতে হবে। পুরো সমাবেশ গানের কথায় ও সুরে মুগ্ধ, আবিষ্ট। আরো গান চাই।
দুইদিনে যথেষ্ট সময় আছে। পরে আবারও গান শোনা হবে। সভাপতির বক্তব্যই তো মুখ্য। হেমন্ত সরকার বাড়ি থেকেই ভাষণের মুসাবিদা করে এনেছিলেন। অসাধারণ বাগ্মিতায় দীর্ঘ দেড় ঘন্টার ভাষণে হেমন্তদা যেভাবে মৎস্যজীবীদের সমস্যাবলী তুলে ধরার পাশাপাশি ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে জমিদার তন্ত্রকে তুলোধোনা করলেন - নজরুল মুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন। ব্রিটিশকে তাড়িয়ে স্বরাজ প্রতিষ্ঠা অবশ্যই দেশমাতৃকার মুক্তি, কিন্তু সে স্বরাজ যদি জমিদারদের হাতে আসে - তাহলে দরকার নেই সেই স্বরাজের। পৃথিবীর কোনো দেশে নদ-নদীতে মাছ ধরার জন্য মৎস্যজীবীদের খাজনা দিতে হয়না। অথচ এখানে জমিদার বাবুরা বন্দোবস্ত নিয়ে তাদের কাছ থেকে যথেচ্ছ কর আদায় করেন, হাটে-বাজারে তোলা আদায় করেন। এই জমিদার বাবুরাই তো স্বরাজ্য দলের নেতা, তাঁরাই ছোটো লাটের কাউন্সিলে ব্যবস্থাপক সভার সদস্য। বাংলার স্বরাজ্য দলের সম্পাদক নিজেই গোয়ালন্দ জলার মালিক। তাঁরা তো এখনি তাঁদের এই অনৈতিক অধিকার পরিত্যাগ করতে পারেন। মৎস্যজীবীদের ভিতর থেকে কাউন্সিলে সদস্য নির্বাচন করতে হবে। সাধারণ তৌজির খাজনা বাড়েনি, অথচ জলার খাজনা শতগুণ বেড়ে চলেছে।প্রকৃতির দান স্রোতস্বিনী নদীতে মাছ ধরার জন্য খাজনা দিতে হবে কেন? এইসবের বিহিত করার উদ্দেশ্যে তিনি ব্যবস্থাপক সভায় বেঙ্গল ফিশারিজ বিল এনেছেন। তার মুখ্য বিষয়গুলি তুলে ধরলে বিপুল করতালিতে সভায় গৃহীত হলো। শিক্ষা প্রসঙ্গে যেসব কথা বললেন তাও বেশ ব্যতিক্রমী। জেলের সন্তান লেখাপড়া শিখে উকিল মোক্তার বা অফিসার হয়ে যদি আর পাঁচজনের মতো বাবু হয়ে যায়, নিজ সম্প্রদায়ের কথা না ভাবে, না সংযোগ রাখে, তাহলে দরকার নেই ওরকম লেখাপড়ার। সমাজ অলস পরভোজীরাই যত অনিষ্টের মূল। সভাপতির পদ ছেড়ে দিতে চাইলেও হেমন্ত সরকারকে তৃতীয় বারের জন্য আসাম ও বঙ্গপ্রদেশ মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত করা হলো।
দ্বিতীয় দফার সভায় নজরুলকে আবার গান শোনাতে হলো। মানুষ জাগরণী গান শুনতে চায়। কালিপদ'র নেতৃত্বে সাত-আটজন নারীপুরুষ মিলে কোরাসে গাওয়া হলো 'কারার ঐ লৌহকবাট'। হেমপ্রভা মজুমদার সহ বিভিন্ন অতিথিরা বক্তৃতা দিলেন। নারীশক্তির জাগরণে হেমপ্রভার আহ্বান এতোই আন্তরিক এবং অন্তর্ভেদী যে অন্দরমহলের মহিলারা সংগঠনে যোগ দিতে সহজেই আগ্রহী হয়ে পড়বেন। এই এলাকার নারীদের এই অগ্রণী এবং সক্রিয়তা দেখে চমৎকৃত নজরুল রাত্রিবেলার আসরে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। নিশ্চয় হেমপ্রভা দেবীর নারী সমিতির একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। কিন্তু তিনি আরেকটি তথ্য যোগ করলেন - মাদারীপুরে ছেলেদের স্কুল হবার আগে মেয়েদের জন্য উচ্চবিদ্যালয় স্থাপন হয়। বারো বছর আগে মহকুমা শাসক ডনোভান সাহেব শুধু বালিকাদের জন্য এই স্কুলটি স্থাপন করে একটা বিরাট কাজ করে দিয়ে গিয়েছেন।
পরদিনের সম্মেলনে বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিগণ তাঁদের সুচিন্তিত প্রস্তাবগুলি সভায় তুলে ধরলেন। আয়োজক পক্ষের সম্পাদক এবং সভাপতি প্রতাপ চন্দ্র গুহরায় এবং সম্পাদক কার্তিক চন্দ্র মল্লবর্মণ ধন্যবাদ জ্ঞাপক অথচ ভারি সুন্দর সমাপনী বক্তব্য দিলেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল হেমপ্রভা দেবীর সাধারণের মধ্যে মিশে যাওয়া। মঞ্চে তিনি থাকেন কম। প্রায়শই তাঁকে দেখা যায় আশেপাশে কোনো জটলায় বসে আলাপচারিতায় মগ্ন, কিংবা এমনিই বসে আছেন। এই মুগ্ধতা উঠে এলো নজরুলের কবিতায়। বিদায়ী রাতের আড্ডা শেষ হলে নজরুল গুনগুন করে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে লিখে ফেললেন গান -
কোন অতীতের আঁধারের ভেদিয়া আসিলে আলোক জননী।
প্রভায় তোমার উদিল প্রভাত, হেমপ্রভ হলো ধরণী।
(ক্রমশ)
