সেদিনের রিইউনিয়নে না গেলে নূপুর জানতেই পারত না, তাদের ক্লাসের শান্ত নিরীহ কুন্তল একজন বড়ো পুলিশ অফিসার। স্কুলে পড়ার সময় গান শিখতো, কিন্তু এত ভালো গাইতে পারে সেটা জানত না। চারটি গান শুনিয়েছিল। নূপুরের অন্তর ছুঁয়ে গেল 'পুরানো সেই দিনের কথা' রবীন্দ্রসংগীতে। মিতা বলেছিল, 'কুন্তল বৃষ্টির টানেই গানের স্কুলে গেলেও বৃষ্টির ছোঁয়া পায়নি। বৃষ্টি ছুঁয়েছিল ওদের অন্য ক্লাসমেটকে। বৃষ্টি এখন আমাদের ক্লাসমেট রাকেশের ঘরনী।'
মিতা, কুন্তল আর নূপুরদের পাশাপাশি গ্রামে বাড়ি ছিল। ওরা এক স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করলেও খুব একটা ছেলেদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেনি কখনোই। মিতা পুরোনো বন্ধুদের খোঁজ খবর রাখে। ওর মোটামুটি সকলের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, তার কারণ বোধ হয় সহজে মিশতে পারা। নূপুর নিজেকে সবসময় গুটিয়ে রাখতেই ভালোবাসত, এখনো। কুন্তলের গান শেষ হতেই মিতা উঠে গিয়ে কুন্তলের হাত ধরে নূপুরের পাশের চেয়ারে এনে বসিয়ে দিল। নূপুরকে দেখিয়ে বলে, 'চিনতে পেরেছিস একে?
কুন্তল বলে ওঠে, নূপুরকে চিনব না? বইয়ে মুখ গুঁজে থাকা মেয়েটিকে ভোলা যায়? তা, আছিস কেমন?
চলে যাচ্ছে। বড়োবাবুর দায়িত্ব সামলে গানটাকে বেশ ধরে রেখেছিস। তুই ও কম বইপোকা ছিলি না। আর একটা কৌতূহল হচ্ছে, বলব?
পুষে রাখিস না, বলে ফেল। কলেজে পড়ানোর গাম্ভীর্য স্কুলে পড়ার সময়ই রপ্ত করে নিয়ে ছিলি! বেশ আছিস। স্বপ্ন দেখতাম শিক্ষক হব, হয়ে গেলাম পুলিশ। কত স্বপ্ন অধরা থেকে যায়!
তোর হাতে লাঠি, ভাবতেই পারছি না। আসামীদের মারতে পেরেছিস কখনো?
হা হা করে, সেকি হাসি কুন্তলের। 'এটা একটা প্রশ্ন হলঃ? ভেবেছিলাম কী না জানতে চাইবি - ট্রেনিংয়ে সব শিখতে হয়। কাঁচা খিস্তি পর্যন্ত শিখতে হয়েছে, তবে নিজের মতো করে সবদিক বজায় রেখে অ্যাপ্লাই করতে হয়। আমাদের স্কুলের একটা গ্রুপ আছে, জয়েন করতে পারিস।
স্বরচিত কবিতা পাঠের জন্য নূপুরের ডাক পড়লে, কুন্তল কী এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল - তাতে মিশে ছিল সমীহ মিশ্রিত বিস্ময়। কবিতা সেও লেখে, কিন্তু প্রকাশ করে না।
রিইউনিয়ন থেকে ফিরে আসার পর নূপুরের বিষন্নতা কেটে গেছিল। কুন্তলের সঙ্গে অনেক কথা হয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক বিষয়ের - বর্তমান অতীত ভবিষৎ নিয়ে। শেষে, সাহিত্য নিয়ে। এক টেবিলে বসে ওরা খেলো। স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ হলে মন্দ কী? বন্ধু বলতে ওরা ক্লাসমেট। কো-এড স্কুল। দশ-বারোটি স্কুলের ছেলেমেয়েরা পড়তে আসত। ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানে বাজে মেয়ের ছাপ্পা পড়ে যাবে - সেই কারণে নূপুর নিজেকে গুটিয়ে রাখত। ভালো মেয়ে হয়ে থাকার মোহে নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দেয়। দুষ্ট ছেলেরা কত রকমভাবে বিরক্ত করত। ইতিহাস দিদিমণির পড়া করে আসায় কোপে পড়েছিল বিশেষ একজন ক্লাসমেটের। আসলে দিদিমণি পড়া করে আসায় কোনো মেয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন, আর মেধাবী ছাত্রদের দাঁত কিড়মিড় করে গালমন্দ করেন, তাহলে আর কী মেধাবী দুষ্টু ছাত্রটি চুপ করে বসে থাকে? বুদ্ধি খরচ করে বের করে ফেলে দিদিমণিকে জব্দ করার বদলে সহপাঠিনীকে কৌশলে এমন শিক্ষা দেবে যাতে সে ইতিহাস পড়া করে আসার ভূত মাথা থেকে নামিয়ে দেবে। নূপুরকে অপদস্থ করার জন্য ওর নামে স্কুলের ঠিকানায় ইংরাজিতে চিঠি ! স্যারেরা ডেকে পাঠালেন, 'তোমার নামে একটা চিঠি এসেছে, কে দিতে পারে বলে মনে হয়?'
নূপুর কার নাম বলবে? হাপুস নয়নে কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে। নূপুরের জীবনে একটা ব্যাপার আগাগোড়া রয়ে গেছে - সবকিছু দেরিতে। সাত বছরে ওয়ানে ভর্তি হওয়ায় হাইস্কুলের সহপাঠিরা অনেকে বেশ ছোটো ছিল। শরীর-স্বাস্থ্য ভালো থাকায় বয়সটা বেশি মনে হত। ফেল করা দাদা-দিদিদের সঙ্গে গুলিয়ে এই কুন্তল একদিন দিদি বলেছিল। তবে, চিঠিটা কুন্তল দেয়নি সে বিষয়ে নিশ্চিত। সেই চিঠিতেও দিদি বলে সম্বোধন ছিল - নূপুরের পক্ষে হজম করা বেশ শক্ত হয়ে পড়েছিল। আরে বাবা সে তো আর ফেল করেনি। ওয়ান থেকে ক্লাস টেন পর্যন্ত ফার্স্ট, সেকেণ্ড নয় তো থার্ড হয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। টুকরো টুকরো স্মৃতি ! বর্তমানের তাপ শুষে নিচ্ছে। সমীরণ দূরে সরে গেছে। শূন্য মন্দির, এভাবে কী বাঁচা যায়? ছায়া চাই। শীতল ছায়া! প্রতিমুহূর্তে অপমান অপদস্থ নয় - দরদ চাই, সম্মান চাই, সমাদর চাই, মর্যাদা চাই, সোহাগ চাই... পুরুষের কাছে যে চাওয়া নারীর আজন্মের। শূন্য মন্দিরের দ্বার কী উন্মুক্ত হতে চাইছে। কেন কুন্তলের মুখটা বারবার ভেসে উঠছে!
ঘুমের ঘোরে ছেলে মা বলে জড়িয়ে ধরায় নূপুরের সম্বিৎ ফেরে। ছি! কী আজেবজে ভাবনা ভাবছিল! ধ্যূস! ছেলেকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে স্বগতোক্তি করে, 'মা-ছেলের স্বর্গে' কোনো অশুভ ছায়া পড়তে দেবে না। কিছুতেই না!
(ক্রমশ)
