গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

নিখোঁজ কবির ডায়েরি (দ্বাদশ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অভিজিৎ রায়


[একজন সৃষ্টিশীল মানুষ একদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। প্রাত্যহিক জীবনের দ্বিধা দ্বন্দ্বে জীর্ণ জীবনকে এক নতুন রসের ধারায় নিজেকে সিক্ত করতে তার এই স্বেচ্ছানির্বাসন নাকি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে তা তিনি নিজেও জানেন না। অথচ তার এই নির্বাসনকালে তার জীবন ও লেখা বাঁক নেয় এক নতুন পথে। নিজের সৃষ্টিকে নতুন করে তিনি কি গ্রহণ করতে পারবেন নাকি বিসর্জন দেবেন অবসাদের গভীর অন্ধকারে? এই টানাপোড়েন নিয়েই লেখা অভিজিৎ রায়ের এই নতুন উপন্যাস "নিখোঁজ কবির ডায়েরি"।]

(বারো)

পিকুকে কোলে নিয়েই বিকেলে বেড়াতে বেরিয়েছে মধুপর্ণা। ওর আগেই সৃজিত হোম-স্টে ছেড়ে বেড়িয়ে নদীর উপর ভাঙা গাছটায় বসে সিগারেট ধরিয়ে কী সব উল্টোপাল্টা ভাবছিল নিজের সম্বন্ধে আর ট্যাবে দু'চার লাইন কবিতা লেখার চেষ্টা করছিল। গদ্য লেখার ফাঁকে ফাঁকে এইসব কবিতা লেখার কারণে তার কাহিনির ছন্দ কেটে যায় না এটা শুনে বেশ অবাক হয়েছিলেন অরুময়দা।

- আসলে দাদা, এই মুহূর্তে আমার অবচেতনে ভাবনার স্ফুরণ তো কবিতার শরীর গড়ে তুলছে। হয়তো কবিতাটা লেখা হলে আমি আমার সেই অবচেতনের খুব কাছাকাছি পৌঁছতে পারব যা গদ্যের কাহিনির মধ্যে বুঁদ হয়ে ঢুকে পড়লে কোনওমতেই পারি না দাদা।

- তুমি যে এটা উপলব্ধি করতে পেরেছ এটা খুব ভাল ব্যাপার সৃজিত। আমি এখনও এইসব বুঝতে পারি না। বিশেষ করে উপন্যাস লেখার ফাঁকে অন্য কিছু লিখতে গেলে ভাবনাগুলো হারিয়ে যায়।

- দাদা, ভাবনা হারিয়ে গেলে আমার খুব আনন্দ হয়। হঠাৎ করেই নতুন ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে চরিত্ররা হাঁটা দেয়। নতুন অনুভব, নতুন অভিমান, নতুন প্রেম, ক্ষোভ, ঘৃণা। একটা নতুন ট্যুইস্ট পেয়ে যায় পাঠক-পাঠিকা।

অরুময়দা হো হো করে হেসে উঠলেন। "তা ভালই বলেছ কিন্তু একবার বৈপরীত্যের কথাটাও তো ভাবতে হবে। উপন্যাসের মাঝপথে চরিত্রেরা যদি তাদের চরিত্রবদল করে ফেলে তাহলে পাঠকরা তাদের সম্বন্ধে কী ভাববে? তুমি যদি চরিত্র এস্টাব্লিসড না করতে পার তাহলে কাহিনিটাও তো এস্টাব্লিস করা যাবে না ভাই!"

- আচ্ছা দাদা, মানুষ কি বদলায় না? মাঝবয়সে এসে অনেক কারণেই তো মানুষকে বদলাতে হয়। কত আপোষহীন মানুষই তো নিরাপত্তার কারণে পরবর্তী জীবনে আপোষ করে অনেক অনৈতিক কাজকর্মের সঙ্গে। তাই না?

অরুময় এক্কেবারে চুপ করে গেলেন। সোফায় বসে একটা বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিলেন। খানিকক্ষণের জন্য এক্কেবারে চুপ করে বসে রইলেন। তারপর উঠে ড্রয়িংরুমের মধ্যে বেশ খানিকক্ষণ পায়চারি করে বললেন, "তুমি ঠিকই বলেছ সৃজিত। জীবনের পারিপার্শ্বিকতা মানুষকে নতুন করে গড়ে তোলে। সেটা ভাল না খারাপ তা অবশ্য সেই মানুষটির সমস্ত গোপন বাধাবিপত্তির কথা না জেনে বলা সম্ভব নয়।"

- সে তো বটেই দাদা। সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতিবিদ মানে দুর্নীতিগ্রস্ত, আপোষকামী আবার শিল্পী-লেখক-কবি মানেই জীবনের সমস্ত মরাল স্টোরি মেনে চলা একজন আদ্যন্ত সৎ মানুষ। তাদের এই ভাবনার দায় তো কোনও সৃষ্টিশীল মানুষ সারাজীবন বয়ে নিয়ে বাঁচতে পারেন না। তাই না? কিন্তু কেউ কেউ নিজেকেই পরিবর্তিত রূপে দেখে বাঁচতে পারেন না বা পছন্দ করেন না। অবশ্য এই ঘাত-প্রতিঘাত চরিত্রের নানান কথাবার্তায় পাঠকের কাছে পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারলে নিশ্চয় তারা তা বুঝতে সমর্থ হবেন।

"আরে। আপনি এখানে বসে কী লিখছেন?" মধুপর্ণা পিকুকে কোলে নিয়ে সৃজিতের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে।

- আমার যা কাজ। লেখার চেষ্টা করে চলা। নিজের অবচেতনের অন্ধকার থেকে আলোর খোঁজ করা। যা পাঠক-পাঠিকাকে নতুন করে ভাবাবে বা পথ দেখাবে।

- কবিতা লিখছেন?

- হ্যাঁ। এখন তাইই লিখছি।

- সকালে যে বললেন, একটা উপন্যাসের কাজে এখানে এসেছেন?

- হ্যাঁ। সে কাজ তো এখানে বসে করা সম্ভব নয়। তাছাড়া মাঝেমধ্যে ভাবনাচিন্তাগুলোকে খোলা রাস্তায় ছেড়ে দিতে হয়। চরিত্রের ঘেরাটোপে লেখক বন্দী হয়ে গেলে মাঝেমধ্যে কাহিনির দমবন্ধ হয়ে যায়। তাই তাকে খোলা বাতাসে এনে ফেলতে হয়।

- তা কী লিখলেন? শোনাবেন?

- নিশ্চয়। তুমি একটু ঘুরে এসো ওদিকটা থেকে। ওদিকে একটা খুব সুন্দর ভুটানি বস্তি আছে। ভালো লাগবে। আমি ততক্ষণ দেখি কিছু খাড়া করতে পারি কিনা!

মধুপর্ণা পিকুকে নিয়ে ভুটানি বস্তির দিকে এগিয়ে যায়। সৃজিত মধুপর্ণাকে পিছন থেকে বেশ খানিকক্ষণ লক্ষ্য করে। একজন অবসাদগ্রস্ত রোগীর মতো কি সত্যিই মধুপর্ণাকে লাগছে? সে নিজেও তো একজন অবসাদগ্রস্ত রোগী। তাকে দেখে কি তা বোঝা যায়? মধুপর্ণা বুঝতে পেরেছে? বিনয়বাবু? ভিতরে ভিতরে রক্তাক্ত হওয়া মানুষ চেনা কি অত সহজ কাজ! সে যেমন তার নিজের লেখার আড়ালে সমস্ত অবসাদ লুকিয়ে রাখে, তেমনই মধুপর্ণা হয়তো অন্য কিছুর আড়ালে। অঞ্জনার কি অবসাদ নেই? নিশ্চয় আছে। সেও হয়তো অন্য কোনও কিছুর আড়ালে নিজের অবসাদ লুকিয়ে বেঁচে থাকার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে রোজ। কেউ পালিয়ে লড়াই চালায় আর কেউ যাবতীয় লড়াইয়ের মধ্যে থেকে নিজেকে অবসাদের করাল গ্রাস থেকে বাঁচানোর চেষ্টা চালায়। এইসব ভাবনার মধ্যে নিজেরই লেখা চার লাইন কবিতা মনে পড়ল তার।

"ফাঁকি খোঁজে ফাঁক আর পথের সীমানা;
চাঁদ নিজে যেচে খোঁজে ছায়াদের ভিড়;
পথ খোঁজে পথিকের অচেনা ঠিকানা,
প্রত্যেকের মুঠো ভর্তি নদীর শরীর।"

এর চার লাইনের আগে আরও কিছুটা লেখা ছিল। এখন আর মনে পড়ছে না। কিন্তু, মনে হচ্ছে অবসাদ যেন সত্যিই নদীর শরীরের মতো। ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না অথচ সবাই ধরে আছে তাকে মুঠোয়। অন্ধকার রঙের আলোয় অবসাদ তার একান্ত নিজস্ব রেখার আঁচড়ে আমাদের হৃদয়ে ক্ষতস্থান তৈরি করে। সবসময়ে রক্তপাত। কোনও চিহ্ন নেই অথচ চিহ্নের আখ্যান অবসাদ লিখে যাচ্ছে জীবনের ক্যানভাসে।

- কি ব্যাপার সৃজিতদা? কিছু লেখা হল?

- না। কিচ্ছু হল না। চল ফেরা যাক।

পিকু মধুপর্ণার কোলে বসে থেকেই ভৌ ভৌ করে ডেকে উঠল। বোধহয় ঘরে ফেরার সিদ্ধান্তে সম্মতি জানাল।

(ক্রমশ)