গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

আমার মা (সপ্তবিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



অচিন্ত্য সাহা


দেখতে দেখতে পাঁচ বছর কেটে গেল। শিউলি এখানে আসার পর থেকে সুশীল বাবু অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়েছেন। ধীরে ধীরে তাঁরও বয়স বাড়ছে। কিছুদিন আগেই তাঁর আশি বছরের জন্মদিন পালিত হলো। ছেলে, ছেলে-বৌ, নাতি-নাতনি এবং পাড়ার কয়েক ঘর প্রতিবেশী মিলেমিশে বেশ হৈচৈ করেছেন। ওরা চলে যাবার পর আবার আগের জীবনে ফিরে গেছেন। ছেলের আর বেশিদিন চাকরি নেই। ওরও অবসর নেবার সময় এগিয়ে এলো। ছেলের ইচ্ছে থাকলেও বৌমার এখানে এসে থাকার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। প্রথম কারণ হলো ওদের ছেলেমেয়ের পড়াশোনা। তাছাড়া এই পাড়াগাঁয়ে যানবাহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ততটা উন্নত নয়। ভালো ডাক্তার নেই, হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্র নেই। রাতবিরেতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই কৃষ্ণনগর হাসপাতাল ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। রাস্তাগুলোর অবস্থা খুব খারাপ। হাসপাতাল পৌঁছানোর আগেই একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তবুও এখানে মানুষ থাকে, বেশ ভালো ভাবেই বসবাস করে। নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায়, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নাকে সঙ্গী করে বাঁচে। সুশীল বাবু এবং প্রতিমা দেবীর আশ্রয়ে শিউলি ও সুকান্ত যেন তাদের হারিয়ে যাওয়া জীবনকে খুঁজে পেয়েছে। সুকান্ত দাদুর কাছে নতুন নতুন গল্প শোনে, দাদুর কাছে বসে পড়াশোনা করে, কিছু জিজ্ঞাস্য থাকলে দাদুর কাছে জেনে নেয়। এতে সুশীল বাবু যারপরনাই খুশিই হন। এই দুটো সহজ সরল নিষ্পাপ শিশুকে পেয়ে প্রতিমা দেবীও নিজের ছেলে এবং নাতিনাতনির কথা ভুলে গিয়েছেন। আম এবং লিচুর মরসুম এলে কাজ একটু বেড়ে যায় বটে, কিন্তু সুকান্ত এবং শিউলি এব্যাপারে সুশীল বাবুকে যথেষ্ট সহযোগিতা করে। দিদুনও ওদেরকে বুকে আগলে রাখেন। এখন ওদেরকে আলাদা ঘরে থাকতে হয় না। দিদুনের কাছে শিউলি আর দাদুর কাছে সুকান্ত থাকে। দাদুর সাথে ওরা মাঝে মধ্যে কামারহাটি কলোনি, রেলস্টেশন, বেজপাড়া, ঘাটেশ্বর, রাজাপুর বেড়াতে যায়। কালী পুজোর দিন দাদুর সাথে বেলপুকুর গ্রাম পরিক্রমা করতে যায়। ওর বেশ লাগে। জীবনের সব দুঃখ যন্ত্রণা ভুলে যায়।

রঙদোলের সময় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অনুগামীরা নবদ্বীপ পরিক্রমা করেন। দলে দলে মানুষ নবদ্বীপ ও তার আশেপাশের দ্বীপগুলি পায়ে হেঁটে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। অপেক্ষাকৃত বয়স্করা ট্রলি, রিকশা বা গরুর গাড়ি ব্যবহার করেন। তখন ওঁরা দলবেঁধে বেলপুকুর গ্রামে আসেন। এই গ্রামও দর্শনার্থীদের কাছে এক পবিত্র স্থান। তাঁরা জানেন যে, বেলপুকুর গ্রামের সাথে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নাড়িরটান আছে। এই গ্রামে নাকি মহাপ্রভুর মামার বাড়ি। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গড়গড়ি নদী। এখন কেউ এটাকে নদী বলেন না, বলেন গড়গড়ে খাল। জলাঙ্গী নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে রাজাপুর গ্রাম পেরিয়ে গঙ্গা নদীতে গিয়ে মিশেছে। এখন নদীতে বেশ জল। এই সময়টা মাছ ব্যবসায়ীদের মনে আনন্দের বান ডেকে যায়। একদিকে জলাঙ্গী অপরদিকে গঙ্গা। দুই নদী থেকে নানা প্রজাতির নানাবিধ মাছ এই নদীতে আশ্রয় নেয়। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরাও ছিপ, গামছা, ছেঁড়া মশারী নিয়ে মাছ ধরতে নেমে পড়ে। সুকান্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। ওর মনের ভেতরের সুপ্ত ইচ্ছেটা জেগে ওঠে। কিন্তু দিদির কড়া হুকুম সেই ইচ্ছেটাকে দমিয়ে দেয়। শীতের সময় জল শুকিয়ে যায়, সামান্য পরিমাণে কাদাজল থাকে সেই সময় নদীগর্ভে কচু গাছের জঙ্গল হয়ে যায়। যাঁরা হাটে-বাজারে শাকপাতা বিক্রি করে সংসার চালান তাঁরা এখান থেকে কচুরডগা, লতি এবং কলমি শাক কেটে নিয়ে গ্রাম শহরের বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যান। লোকমুখে শোনা যায় এখানকার কচু শাক নাকি অনেক অনেক দূরে এমনকি কলকাতার বাজারেও বিক্রি হয়। গড়গড়ে নদী হোক আর খালই হোক সে যে কত মানুষের জীবন বাঁচিয়ে রেখেছে তা ভাবলে সত্যি অবাক হতে হয়। বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়েছে তার সঙ্গত কারণ এখানেই লুকিয়ে আছে। মা যেমন তাঁর সন্তানকে নিজের স্তন পান করিয়ে অতি সযতনে আগলে রাখেন নদীও তেমন মায়ের মতো তার দুপাশে বসবাস করা সন্তানসম মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছে। এই সন্তানকে সে আপনার গর্ভে ধারণ করেনি কিন্তু সন্তানকে বাঁচানোর জন্য তার ভূমিকা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। শীতকালে প্রায় প্রতিটি নদীর ক্ষীণকায় রূপ দেখলে চোখের সামনে আমার মা-এর শেষ বয়সের লোলচর্মসার শরীরের ক্ষীণকায়া রূপ এবং তাঁর দুটি ঝাপসা ঘোলাটে চোখ ভেসে ওঠে।

পাঁচ বছর কাটানোর পর এদিকের গ্রাম গঞ্জ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পেরেছে সুকান্ত। এখানকার অনেক মানুষের সাথে তার কথাবার্তা হয়। অনেকে দারিদ্র্য সীমার নীচে বাস করে। বেলপুকুরে খুব ধূমধাম করে কালীপুজো হয়। ও বুঝতে পারে না যে গ্রাম শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মামার স্মৃতিবিজড়িত সেই গ্রামে ভক্তিসাধনার স্থলে শক্তিসাধনার পীঠস্থান কীভাবে হয়ে গেল? দাদুর নিকট থেকে বিষয়টা জেনে নিতে হবে। দাদু অনেক কিছু জানেন। অনেক প্রশ্নের উত্তর দাদুর কাছে পাওয়া যায়। মায়ের কথা সে প্রায় ভুলেই গেছে। যখন তার একটু একটু করে বোঝার বয়স হয়েছে তখন থেকেই মাকে শয্যাশায়ী দেখেছে, মায়ের বুকের ওপর ছোটো ভাইকে বুকের দুধ না পেয়ে কাঁদতে দেখেছে। মায়ের চোখে তখন জল ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। দিদি ছোটো ভাইকে কোলে তুলে নিয়ে পাড়ারই কারোর কাছে একবাটি মুড়ি চেয়ে নিয়ে এসে বারান্দায় একটা চটের বস্তা পেতে ভাইকে মুড়ির বাটি দিয়ে বসিয়ে সংসারের নানা কাজ সামলেছে। সবার মুখে একটু খাবার তুলে দেওয়া এবং মা'কে ভালো রাখার জন্য বাবাকে ছোটাছুটি করতে দেখেছে। একদিন মা যখন ঘুমের অচিন দেশে পাড়ি দিয়েছেন বাবাও কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন। দিদির কাছে শুনেছে ছোটো ভাইটাও নাকি মায়ের মতো ঘুমের অচিন দেশে পৌঁছে হারিয়ে গেছে। একে একে সবাই যখন চলে গেছে সুকান্ত তার দিদির হাত ধরে একদিন রাতের অন্ধকারে অজানা অচেনা এক দেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছিল। তারপর এখানে দাদু-দিদার সংস্পর্শে এসে পড়ে। এই দাদু-দিদাই এখন তাদের সবকিছু। দাদুর সাহচর্যে এসে সুকান্ত অনেক কিছু জানতে পারে। দাদু খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন। ওর মনে জমে থাকা রাশি রাশি প্রশ্নের উত্তর দাদুর কাছে পেয়ে যায়।

(ক্রমশ)