গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

আজকের দ্রৌপদী (অণুগল্প)



নন্দিনী সরকার


বাতাসির হঠাৎ সন্ধ্যেবেলা চা খেতে বসে হাসি পেয়ে যায়- ছেলের মহাভারতের গল্প পড়া শুনতে শুনতে। ক্লাস ফোর হল ছেলেটার। আর মেয়েটার শিশু শ্রেণী। ছেলেটা ওর বাপের পাশে বসে বসে ৱ্যাপিড রিডারের গল্প পড়ছে। মহাভারতে দ্রৌপদীর পঞ্চ স্বামীর নাম কি? এই প্রশ্নের উত্তর জোরে জোরে পড়ে পড়া মুখস্থ করছে। সামনেই ওর দ্বিতীয় টার্মিনাল পরীক্ষা। ওর বাবা ছেলের গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে মশা তাড়াচ্ছে। দুপুরের দিকে তেড়ে বৃষ্টি হয়ে রাস্তায় কারেন্টের লাইনের তার খুলে গেছে। তাই কারেন্ট ভো-কাট্টা। কত রাতে আলো আসবে তার ঠিক নেই। এর মধ্যেই বাতাসিকে রাতের রান্না শেষ করতে হবে। নিজেদের যা হোক কিছু হলেও ভাসুরের জন্য স্পেশাল এঁচোর চিঙড়ি করতেই হবে। গতকাল অফিস থেকে ফেরার সময় বেশ দাম দিয়ে এঁচোর কিনে এনেছে। সকালে সাত তাড়াতাড়ি অফিসে যাবার সময় বাতাসি এঁচোর ছাড়িয়ে চিঙড়ি মাছ বেছে ওনাকে রান্না করে দিতে পারেনি। রাতে কারেন্টের যে এই দুর্দশা হবে তখন আর কী ভাবে বুঝবে! জানে ভাসুর মুখে হয়তো কিছু বলবে না, পরে সময় মতো শোধ তুলবে। সেই ভেবেই চাপা দুঃখের মাঝে নিজের অদৃষ্টের প্রতি হাসি পায়। দ্রৌপদী এক সঙ্গে পাঁচ স্বামী কখনো চায়নি। কিন্তু ভাগ্য তাকে টেনে নিয়ে গেছিলো পাঁচ জনের খাটে। বাতাসির জীবনটাও কি কোথাও সেই বিখ্যাত পান্ডবদের বউ এর মতো নয়?

স্কুল জীবনের শেষেই প্রেম করে বিয়ে করলো পাশের পাড়ার বাসবকে। মফস্বল এলাকায় তাই নিয়ে কম কথা চালাচালি হয় নি। কিন্তু সময়ের চাপে তা নিভেও গেছে। বাতাসির বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে বাসবের দাদার বৌ, বাচ্চা হতে গিয়ে মারা যায়। তখন থেকেই ভাসুরের চাউনি বাতাসির ভালো লাগতো না। কিন্তু পর পর দুটো ঘটনা বাতাসির জীবনটাকে এক কুরুক্ষেত্রের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। বাসবের একসিডেন্ট হয়ে কোমরের তলা থেকে অবশ হয়ে যাওয়া আর তার শোকে বিধবা শাশুড়ির সেরিব্রালে কথা বন্ধ হওয়া। ততদিনে অবশ্য বাতাসি দুই ছেলে মেয়ের মা। অবস্থার গতিকে মুখের কথা হারিয়ে ফেলেছে। শাশুড়ির সেবা আর বরকে স্বান্তনা দিতে দিতে নিজের কষ্ট, কান্না সব জলাঞ্জলি দিয়েছে। এতো বড়ো সংসারের বোঝা টেনে নিয়ে চলেছে একা - বাতাসির বড়ো ভাসুর। তাই পাড়ায় তার সুখ্যাতির শেষ নেই। নিজের সংসার না থাকলেও পঙ্গু ভাইয়ের সংসার দেখা, মা- কে দেখা একি চাট্টিখানি কথা! কিন্তু...

ওই যে কিন্তুর কাঁটাটা বাতাসির গলায় বিঁধছে ওটাই সমস্যার। বাতাসিকে মাঝে মাঝেই ভাসুরের ঘরে বাধ্য হয়ে যেতে হয়। এটা সেটা বলে ডেকে পাঠায় ভাসুর অফিস থেকে ফিরে। প্রথম প্রথম বাতাসি বিদ্রোহ করলেও মোদ্দা কথাটা একদিন বাতাসিকে চেপে ধরে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছে ভাসুর। সংসারের সব কিছু নির্বিঘ্নে চালাতে গেলে এটুকু তো বাতাসিকে করতেই হবে। বাসবও যেন আজকাল অনেক কিছু বুঝেও কিছুই বুঝতে চায় না। দাদা অফিস থেকে ফিরলে আরে ঠারে বলে - "দেখো দাদার কিছু লাগবে কি না"। আর শাশুড়ি তো ফ্যালফ্যাল করে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থাকে আর চোখ দিয়ে জল পরে।

ছোট দেওর, যে নাকি এককালে দিদির মতোই বাতাসিকে ভালোবাসতো সেও বাড়ির পরিস্থিতি দেখে কলকাতাতে বিয়ে করে সংসার বসিয়েছে। বাড়ির ধারে কাছে আর বিশেষ ঘেঁষে না। দরকারে তাকে পাওয়া এখন চাঁদ ধরার সামিল। কয়েক মাস আগে কোনো একটা দরকারে বাসবের ভাই দেশের বাড়িতে এসেছিল। দেওরের বাচ্চা হবে শুনেছে বাতাসি। ওর বৌ এর নাকি এডভান্স স্টেজ। হঠাৎ কিছু নিয়ে রান্নাঘরে দু একটা কথা কাটাকাটি হওয়াতে ভাইয়ের মতো দেওর বিশ্রী ভাবে বাতাসির গায়ে হাত দেয়। জোর করে হাত সরিয়ে দিতে গেলে দেওর বলে ওঠে "বড়দার সব আবদার মেনে নিতে পারো আর আমার বেলায় তুমি এতো কৃপণতা করছো কেন?" ব'লে বিশ্রী ভাবে চোখ টিপে ইশারা করে। "মেজদা তো আর কোনো কম্মের নয়, তুমি বড়দার সঙ্গে সঙ্গে আমারও একটু সেবা করলে তোমার সংসারেরই উপকার হবে"। বাতাসির রাগে, ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নিতে গিয়েও মনে পরে যায় দেওর আসার পরেই ওর কাছে ছেলের কলকাতায় গিয়ে পড়ার কথা তোলার বিষয়টা। ওফ ভগবান! বাস্তব জীবনটা কী এতটাই কঠোর, এতটাই ঘৃণ্য! কোথাও মনুষত্ব বলে কিছুই কি বেঁচে নেই এই পৃথিবীতে!

আবার কানে ভেসে এলো ছেলের পড়া। এবার বাবা ছেলেকে প্রশ্ন করছে, "বলতো দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামীর নাম কি?"

ছেলে হাতের কর গুনে গুনে উত্তর দিচ্ছে। তবু তো পঞ্চসতীর মধ্যে স্থান পেয়েছে দ্রৌপদী। বাতাসির জায়গাটা ঠিক কোথায় ভেবে পায়না ও নিজেই। এই রে, এঁচোড়ে নুন দিয়েছে কিনা খেয়াল হচ্ছে না। একবার চেখে দেখতে হবে। ভাবতে ভাবতে হাতায় করে কড়া থেকে একটু তরকারি তুলে চেখে দেখতে দেখতেই অন্যমনস্ক ভাবে বাঁ হাতে নিঃশব্দে চোখের জলটা মুছে ফেলে।