গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

মুহূর্ত



অনিন্দিতা মুখার্জী সাহা


নিলয় ঘরে ঢুকেই দেখল, শর্মী রান্নাঘরে রান্না করছে আর তার সামনে বসে খেলনা বাটি ছড়িয়ে খেলছে ওদের পাঁচ বছরের মেয়ে ঝুলন। সামনের ফ্যানটা চলছে ঠিকই, কিন্তু রান্নাঘরে ঘেমে নেয়ে একসার শর্মী।

রান্নার গরমে কষ্ট পাচ্ছে ওর ছোট মেয়েটাও, কিন্তু তাও একনাগাড়ে মায়ের সামনে বসে খেলেই যাবে।

খুব শান্ত আর লক্ষ্মী মেয়ে নিলয়ের।

বাবাকে দেখেই হাতের পুতুলটা পাশে রেখে ছুটে এল ঝুলন। বলল -

"বাবা, তুমি কখন এলে? গরমে কষ্ট হচ্ছে?"

পাঁচ বছর হয়ে গেল, এখনও আদো আদো করেই কথা বলে ঝুলন। মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো চুল। নিলয় দেখল, শর্মির ওড়না দিয়ে আবার শাড়ি পরেছে, কপালে লাল টিপ

নিলয় বলল, "কি ব্যাপার, আজ এত সেজেছে আমার ঝুলন মা?"

ঝুলন আধো আধো করে বলল, "বা রে, আমি যে আজ মা হয়েছি, দেখো না কত রান্না করলাম!"

তারপর একটু দাঁড়িয়ে দৌড়ে রান্নাঘরে চলে গেল ঝুলন। এক গ্লাস ভর্তি করে জল এনে দিল। নিলয় এক চুমুকে জলটা খেয়ে নিল। তারপর ওড়না দিয়ে বানানো শাড়ির আঁচল দিয়ে নিলয়ের কপালটা মুছিয়ে দিল ঝুলন।

বাড়ি থেকে কিছু দূরেই নিলয়ের মস্ত কাপড়ের দোকান। দুপুর, সন্ধ্যায় দোকান থেকে বাড়ি এসেই খাওয়া-দাওয়া করে।

যতবার দোকান থেকে আসে, ততবার ওর ছোট্ট মেয়েটা এসে জল দেয়, কপালটা মুছিয়ে দেয়। নিলয় দেখল, ঝুলন ওর গায়ে প্রায় লেপ্টে দাঁড়িয়ে আছে। নিলয় মজা করার জন্য বলল,

"ঝুলন মা, তোমার যখন বিয়ে হয়ে যাবে, শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে, তখন আমাকে কে জল দেবে এভাবে?"

ঝুলন আরও সরে এসে নিলয়ের গায়ের কাছে দাঁড়াল। তারপর মুখটা নিলয়ের ঘাড়ের কাছে ঢুকিয়ে দিল। নিলয় বুঝল, বিয়ের নাম শুনে লজ্জা পাচ্ছে।

বয়স যাই হোক, বিয়ের নামের সঙ্গে খুব ছোট থেকেই মেয়েরা খুব আবেগপ্রবণ হয়ে যায়। নিলয় মেয়ের মুখটা সামনে এনে বলল,

"বিয়ে হয়ে গেলে ঝুলন বাবাকে ছেড়ে চলে যাবে তো?"

ঝুলন এবার জোর গলায় বলল,

"আমি বিয়ে করবই না। বাবাকে ছেড়ে, মা-কে ছেড়ে ঝুলন থাকতেই পারবে না।

বলছে আর নাক টানছে। বিয়ে শব্দটার সঙ্গে সঙ্গে মা–বাবাকে ছেড়ে যাওয়াটাও মেয়েদের খুব বাচ্চাবেলা থেকেই ভাবায়।

বাবা–মেয়ের খুনসুটির মাঝেই ভাতের থালা নিয়ে হাজির হল শর্মী। ঘড়ি দেখল নিলয় - দুটো বাজে। এক্ষুনি খেয়ে যেতে হবে। ও গেলে তবে বাকি কর্মচারীরা খেতে পারবে। তাড়াতাড়ি হাতটা ধুয়ে উচ্ছে সেদ্ধ দিয়ে ভাতটা মেখে মেয়ের মুখে এক দলা দিল। উচ্ছে একদম পছন্দ করে না ঝুলন।

কিন্তু বাবা দিলে ঠিক খেয়ে নেবে। তারপর প্রতিটা পদ বাবার সঙ্গে সঙ্গে খাবে এই মেয়ে।

অথচ একই জিনিস শর্মী যখন নিয়ে বসে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয় না খাওয়ার বাহানায়। শর্মী তাই রেগে গিয়ে বলে - বাপ্‌ সোহাগী হয়েছে। তাই আজকাল নিলয়ই খাইয়ে দেয় মেয়েকে। এই মেয়ে যেন নিলয়ের প্রাণ কেটে নিয়ে বড় হচ্ছে। অথচ শর্মীর প্রেগন্যান্সির সময় প্রতিমুহূর্তে নিলয় চেয়েছিল, যেন একটা ছেলে হয় ওর। কিন্তু যত বড় হচ্ছে, মেয়ের প্রতি টানটা বেড়েই চলেছে নিলয়ের, আর লজ্জাও লাগে এটা ভেবে - ও কেন ছেলে চেয়েছিল!

নিলয়ের খুব ভালো লাগে, যখন ঝুলন ওর গায়ে লেপ্টে থাকে। মেয়ের গায়ের গন্ধটা যেন সারাক্ষণ নিলয়ের নাকে লেগে থাকে। ডাল দিয়ে ভাত মেখে মেয়ের মুখে দিতেই আবার সেই গন্ধটা নাকে পেল নিলয়।

জোরে জোরে নাক টানতেই চোখটা খুলে ফেলল নিলয়। দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঝুলন। সেদিনের মতোই লাল টিপ, লাল শাড়ি। আজ আর মায়ের ওড়না না - সোনার জরির কাজের সত্যিকারের বেনারসি। মাথায় লেপ্টে আছে লাল রং। এটা আজ আর শুধুই রং না, বাবা আর মেয়ের বিচ্ছেদের কারণ। সোনার গয়না, লাল বেনারসিতে পুরো প্রতিমার মতো লাগছে মেয়েটাকে। একদৃষ্টে দেখছে নিলয়। ওই সুন্দর মুখের মধ্যেই খুঁজে বেড়াচ্ছে ছোট্ট ঝুলনকে - যে সারাদিন বাবার পায়ে পায়ে ঘুরত।

"বাবা, শরীরটা কি খারাপ লাগছে তোমার?" - ধরা গলায় বলল ঝুলন।

"দাঁড়াও!" - বলেই পাশের টেবিলে রাখা জলের বোতল থেকে গ্লাসে জল ঢেলে এনে ধরল নিলয়ের সামনে। নিলয়ও জলটা নিয়ে এক চুমুকে খেয়ে নিল। তেষ্টা না পেলেও মেয়ের দেওয়া জল সবসময় এভাবেই খায় নিলয়।

তারপর বাবার সোফার হাতলে এসে বসল ঝুলন। নিজের হাতের রুমাল দিয়ে নিলয়ের কপালটা মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
"বাবা, ওষুধগুলো সময়মতো খাবে, মাকে খাওয়াবে। আর কিন্তু দেখার কেউ নেই তোমাদের। নিজেদেরটা নিজেদেরই করতে হবে।"

মেয়ে পাশে এসে বসতেই নিলয় নাক টেনে সেই গন্ধটা ধরার চেষ্টা করল। কী কঠিন মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে দু’জনে। কী করে কাটাবে এই মুহূর্তটা, জানে না নিলয়। কাল থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে ও। গায়ে হলুদ, বিয়ে, বাসি বিয়ে - কোনো কিছুতেই ছিল না। বিয়ের নিয়মও নিজের দাদাকে দিয়েই করাল।

ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে নিলয় এড়িয়ে গেছে সবকিছু। সিঁদুর পরার পর মেয়েটার দিকে একবারও তাকায়নি। নিলয় একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে দেখে ঝুলন বলল,

"বাবা, বলো না, তোমার কি শরীরটা খারাপ লাগছে? এভাবে সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লে! আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। এই ক’দিন খুব খাটনি গেছে তোমার, তাই না বাবা!"

বলেই নিলয়ের ঘাড়ে মুখ ঢুকিয়ে দিল ঝুলন। বুকটা ফেটে যাচ্ছে নিলয়ের। কিন্তু চোখের জল ফেলা বারণ। মেয়ের মাথায় ঠোঁটটা ঠেকিয়ে মনে মনে ভাবছে -

"এই মুহূর্তটা যদি স্থির হয়ে যেত! সময়টা যদি আর না এগোত! মেয়েটাকে আর যেতে হতো না, থেকে যেত এই বুকে।"

"ঝুলন দিদি, চল রে। কাকা, চলো। ওর শ্বশুরবাড়ির লোক তাড়া দিচ্ছে। বলছে, এক্ষুনি রওনা না দিলে সূর্য ডুবে যাবে পৌঁছাতে!"

মুহূর্ত থামল কোথায়, আরও তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল। ঝুলন বাবাকে জড়িয়ে বসেই আছে। দাদার ছেলে ডাকতে এসেছে ওদের। সত্যি, এবার ছেড়ে দিতে হবে মেয়েকে।

মেয়েকে বুকে নিয়েই উঠল নিলয়। ওভাবেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে সোজা উঠোনে এসে দাঁড়াল। সেই উঠোন, যেখানে সাতাশ বছর আগে এভাবেই ছয় দিনের মেয়েকে বুকে আগলে নিয়ে ঢুকেছিল নিলয়। সাতাশ বছর ধরে যত্ন করে বড় করে ওই পথ দিয়েই আবার পাঠিয়ে দিচ্ছে।

মন্ত্র, আগুন আর মাথায় লেপ্টে থাকা লাল রং মেয়েটাকে অন্য গোত্র করে দিল। পর করে দিল এক মুহূর্তে। কিন্তু রক্তটা, মনের টানটা - ওটা পারবে কি কেউ কেড়ে নিতে? কেউ পারবে না। বাবা–মেয়ের টান কোনো গোত্র আলাদা করতে পারে না। ছোট্ট ঝুলন হয়েই থেকে যাবে ও আমার মনে।

ভাবতে ভাবতেই ধানদূর্বা নিয়ে মেয়ের মাথায় দিয়ে বলল নিলয়,

"ভালো থাকিস মা, স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখে থাকিস!"

আশীর্বাদটা নিজেরই কানে বাজল যেন! কিন্তু সত্যি, আজ নিলয় বুঝতে পারছে - শুধু এই মুহূর্তটার জন্যই এখনও ঘরে ঘরে ছেলে সন্তানের এত চাহিদা। ওদের গোত্র বদলাতে হয় না। শিকড় ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয় না। মুহূর্তকেও থামাতে হয় না।

এবার কেঁদে ফেলল নিলয়। দেখল, ঝুলনরা বেরিয়ে যাচ্ছে সদর দরজা দিয়ে। হায় ভগবান, মুহূর্তটা থামিয়ে দাও। একমাত্র মেয়ের বাবা হিসেবে এই একটাই প্রার্থনা করে যাচ্ছে নিলয় - বারবার করে যাচ্ছে।