প্রবন্ধ/নিবন্ধ

গোলাপ ফুল সুন্দর হয় কি করে! ভ্রান্তিবিলাস (পঞ্চম ও অন্তিম পর্ব)



সুভাষ রবিদাস


।। ৫ ।।

আধ্যাত্মিক জগতের সিদ্ধান্তই হল এটা। replacement. শূন্যবাদ। শূন্যই হল পূর্ণ। শূন্যের মধ্যেই নিহিত আছে অন্তত বিশ্বের অনন্ত শক্তি। শূন্য থেকে উদ্ভাবন। শূন্যেই পরিসমাপ্তি। আমরা মহাবিশ্বে অনন্ত শূন্যে বিরাজমান। এর কোন সীমা নাই, কোন ব্যাখ্যা নেই। একে জানার উপায়? এই প্রশ্নের চরম কোনও উত্তর নেই। আর যদি কেউ সেই উত্তর দিতে চায়, সে তার ভাষা হারিয়ে ফেলে। কিভাবে তাকে প্রকাশ করবে সেই ব্রহ্মকে সেটা বোঝার মত অবস্থা রয় না তার। তার জন্যই কি বলা হয়েছে ব্রহ্ম অব্যক্ত!

দশম শতাব্দীর বৌদ্ধ চর্যাপদ ব্যাখ্যা করলে সেই তথ্য প্রমাণিত হয়। ঢেণ্ডনপা লিখেছেন - দুহিল দুধু কি বেণ্টে ষামায়। অর্থাৎ দোয়া হয়েছে এমন দুগ্ধ পুনঃ গাভীর বাঁটে ঠুকবে না। এর গুহ্য অর্থ হল - আপান বায়ু যাকে কুণ্ডলীনি শক্তি বলা হয়েছে তা একবার কুণ্ড থেকে বেড়িয়ে গেলে আর কুণ্ডে ফিরতে পারে না। তখন তার যাত্রা অনন্ত বিশ্বের দিকে। মানে প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের দিকে।

আমরা পাঁচে পঞ্চবান পড়েছি যার অর্থ স্কুল শিক্ষকরা করে থাকেন নিজের মন মত। যেমন পঞ্চ ইন্দ্রিয়। কিন্তু বান অর্থ বায়ু শরীরে নানা অংশে নানা নামে এবং কাজে ন্যস্ত। প্রাণ, আপান, বান, উদান, সমান। ডঃ অসিত বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন দোয়া দুধ গাভীর বাঁটে ফিরে যাচ্ছে।

এই ভুল শিক্ষা নিয়ে আজও মানুষ শিক্ষকতা করছেন। সমস্যা হল ওই সময় যেমন অল্প অক্ষর ব্যবহার হতো তেমন জিজ্ঞেস চিহ্ন, বিষ্ময় চিহ্ন ছিল না। অবশ্য যে ভাষা যত বেশি সমৃদ্ধ তার অক্ষর সংখ্যা তত কম।

মুনিদত্ত সঠিক কি ব্যাখ্যা দিয়েছেন তার কোন অবধারনা নেই। শক্তি যত কেন্দ্র অভিমুখে যায়, অর্থাৎ মস্তিষ্কের সহস্রধারের দিকে, শরীর ও মনে তখন বিরাট পরিবর্তনের ছাপ পড়ে। তপস্বী তখন মানসিক ভারসাম্য রেখে উক্ত শক্তিকে পুনঃ কুণ্ডে ফেরবার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলেই সিদ্ধাচার্য ঢেণ্ডনপা ওই কথা বলেন।

ভুসুকপা বলেন -
আই এ অনু অনা এ জগরে ভংতিএঁ সো পড়িহাই
রাজসাপ দেখি জো চমকিই ষারে কিঁ কঁ বোড়ো খাই।

অর্থাৎ গোড়াতেই নেই হাওয়া বা অনুকণা, এই যে জগৎ ভ্রান্তিতে এমন দেখায়। রাজসাপ দেখে যে চমকিত হয় তাকে কি সত্যিই বোড় বা সাপ খায় বা দংশায়!

মজার কথা হল, একদিন আমার মনে হল কণা'ই একমাত্র চেতন পদার্থ। বিজ্ঞানের ভাষায় একে জড় না চেতন এর কোনও সদুত্তর এখন পর্যন্ত আমি পাইনি। কণা জড় পদার্থ এটাই বৈজ্ঞানিক সত্য। জগৎ যেহেতু তরঙ্গ সম্ভূত, যেহেতু জগতের মূলে রয়েছে পরমাণু, যেহেতু পরমাণুর চরিত্র হিসেবে তরঙ্গের বিস্তার তাই কণাবিশ্বই মূল মহাবিশ্বের উৎপত্তির কারণ।

মহাবিস্ফোরণে প্রথম উৎপন্ন হয় কণা। কণায় আলোকরূপে প্রসারিত। আলো থেকে বেগ বা গতি। গতি থেকে বিস্তার, অর্থাৎ স্পেস। শক্তি বা এনার্জি। এই শক্তি যখন প্রসারিত হল, মূল কেন্দ্র থেকে প্রান্তের দিকে।

প্রান্ত অসীম আর এরই এক স্থানে এসে কণা জোটবদ্ধ হয়েছে। বস্তু উৎপন্ন হয়েছে। বিভিন্ন চরিত্রের পার্টিকেল গুলো পরস্পর বিরোধী, আবার পরস্পরের সহায়ক। এরা উৎপত্তির সঙ্গে সঙ্গে স্পেস তৈরি হয়। একই চরিত্রের কণা মিলে এক বস্তু উৎপন্ন হয়। এভাবেই ভিন্ন ভিন্ন বস্তুর সৃষ্টি। জীবন একটা যৌগিক অণুর ফরমেসন। একটি জীব = একটি জীবন কোশ। একটি জীবন কোশে দুই বা ততোধিক অণুর ফরমেসন থাকে। তার প্রাণের স্পন্দন থাকে তার আত্মাও থাকা সম্ভব! এরা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া পর্যায়ের জীব। এমন মিলিয়ন বিলিয়ন কোটি কোটি অণুজীবের ফরমেসন হল মানুষ, খরগোশ বা বাঘ। বিভিন্ন প্রকৃতির অণু মিলে এতবড় অবয়ব সৃষ্টি করেছে। এই পার্টিকেলস গুলো পরস্পরের মিত্র যেমন, পরস্পরের বিরোধীও তেমনি, তাই জীবদেহে নানা প্রকার ব্যাধির আবির্ভাব। কিছু জটিল ব্যাধিও জায়গা করে নেয়।

চমৎকার বিষয় হল, প্রত্যেক অণুকে জব্দ করতে আরেকটা বিপরীতধর্মী অণু রয়েছে মহাবিশ্ব জুড়ে। এবং আমাদের চেনা বিশ্বের প্রকৃতির মাঝেও।

পূর্ব প্রসঙ্গ ধরে বলি আরও একটা কথা - প্রান্ত অসীম হলেও তার একটি স্থিতিশীলতা আছে। এই স্থিতিশীলতাই হল বস্তু জগৎ। মহাবিশ্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে কিন্তু তা বেলুনের মত। অর্থাৎ মাঝের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে কেবল। কিন্তু এক সময় এটা ধ্বংস হবে। অপরদিকে নতুন জগৎ সৃষ্টি হবে এই নিয়ম চলতেই থাকবে। মহাবিশ্ব সম্পূর্ণরূপে বিনিষ্ট হতে পারে না। এর বিস্তারের ভিত্তিতে। কোনও চরম শক্তি যদি তা আকর্ষণ করতে চায় তাহলে সমগ্র শক্তি আবার কেন্দ্রীভূত হতে পারে এতে অবাক হবার কিছু নেই।

বিষয়টি বোঝার জন্য বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য বিরুআ পাদের পদ উপলব্ধি করা যাক।

চৌষট্টি ঘড়িয়ে দেট পসরা
পইঠেল গরাহক নাহি নিসরা।।
এক স ঘড়ুলী সরুই নাল
ভনতি বিরুআ থির করি চাল।।

স্থির চালাকি করে বিরুআ বলছেন, চৌষট্টি ঘড়াতে পসরা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। গ্রাহক সেখানে ঠুকলে আর বেড়তে পারে না। একটি ঘড়ার সরু নল। বা মৃণাল সম পথ।

চৌষট্টি ঘড়ার মধ্যে একটির সাথে একটা নল যুক্ত। কুণ্ডলীনি শক্তিকে রাজসর্প রূপে কল্পনা করা হয়। গুহ্যশক্তি মস্তিষ্কের সহস্রা দলের সঙ্গে মিলে গেলে সাধক নির্বাণ লাভ করে। এটাই আমার কথিত replacement.

একটি দ্বিধা তো রয়েই যায়, বিজ্ঞান জগত, আধ্যাত্মিক জগত, ধ্যান যোগ বস্তু কণা সব এক জায়গায় এসে মিলে কীভাবে? একটা বিষয় পরীক্ষামূলক। অপরটি কাল্পনিক বা অজ্ঞানতা। তাহলে ধ্যান বিষয়টি একবার বুঝতে হবে। বৌদ্ধিক বিচারে ধ্যান কথাটা এসেছে ঝান শব্দ থেকে। যার অর্থ নিজের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া। নিজের ভিতরে ডুব দিতে পারলে তবেই হয় ধ্যান। নিজের মস্তিষ্কের ভিতর রয়েছে মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্য। আমরা তার দশ শতাংশই জানতে পারি নাই। এই সমগ্র মহাবিশ্ব একটা মস্তিষ্ক। তাই ধ্যানের গভীরে মহাবিশ্বের অলৌকিক ঘটনা ও দৃশ্য চোখে পড়ে। আমাদের মনের গভীরে রয়েছে নানা রকম ভাবনা। সেগুলো নিয়ে তৈরি হয় চিত্রগুপ্তের খাতা।

মূলাধারচক্র স্থূল দেহের মূল আধার। এখানে রয়েছে পঞ্চদল। মধ্যে লং ও চার পাশে বং সং ষং শং। চাটিল শিষ্য ধাম বলেছেন -
ভনই ধাম ফুড় লেহুঁরে জানী
পঞ্চনালে উঠি গেলা পানি।

তিনি ঠিক বলেছেন। পানি জল যেখানে অক্সিজেন হাইড্রোজেনের কণা বর্তমান। কিন্তু এই জল একটি বায়ব পদার্থ। শক্তি। কুণ্ড ছেড়ে প্রথম যে চক্রে গিয়ে থামে তার পাঁচটি দল স্বধিষ্ঠানচক্র।

ধীরে ধীরে উর্ধ্বে উঠে space বা দেশ পাওয়া যায়। কেউ বলেন আরশি নগর। কেউ বলে উঁচা সে উঁচা দেশ। সন্ত শিরোমণি রবিদাসজী বলেছেন বেগমপুরা। অর্থাৎ যেখানে গম বা দুঃখ বলে কিছু নেই। পথ একটিই যাত্রী ভেদে তার বর্ণনা।

কণাবিশ্বে প্রত্যেক বস্তুর কেন্দ্র - প্রান্ত সম্পর্ক আছে তা ঘন বস্তু হোক বা তরল পদার্থ, জড় বস্তু হোক অথবা জীব বস্তু। আধ্যাত্মিক মার্গে ব্রহ্মতালুকে কেন্দ্র ধরা যেতে পারে। তাকেই আমার কবিতায় ঢেউয়ের চূড়া বলেছি। তাহলে জীবের প্রান্ত ভাগ আবশ্যক। এই প্রান্ত ভাগ হল পশ্চাৎ। মহাবিশ্বে যেভাবে শক্তি কেন্দ্র থেকে যাত্রা শুরু করে প্রান্তে এসে ম্যাটার সৃষ্টি করেছে, সেই ভাবে জীব তার বিকাশ ঘটিয়েছে। মাতৃগর্ভে ভ্রূণে প্রথম সৃষ্টি মাথা। মস্তিষ্ক। তার থেকে ধীরে ধীরে শরীরের প্রত্যঙ্গ। ভূমিষ্ঠ হবার পরও তার রুগ্ন পদ ধীরে ধীরে সবল হয়।

পশ্চাতে আছে মূলাধার চক্র। এখানেই শক্তি স্থির। স্থূল জগৎ এটা। প্রত্যেক জীবের প্রাণ কেন্দ্র এটা। প্রাণ কিন্তু বুকের ভেতর নয়, এখানেই স্থিত। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে - হঠাৎ মানসিক ব্যাথা পেলে বা আকস্মিক শোকে বুকের ভেতর ধরাস করে ওঠে কেন? বিদ্বজ্জনদের উদ্দেশ্যে বলি - মায়া থেকে মুক্ত হতে পারে খুব কম সংখ্যক সাধক। কোন না কোন রূপে সে মায়ার অধীন। ধরুন রামকৃষ্ণদেব, সে মা ভবতারিণীর প্রতি আসক্ত। ঠিক যে কথা বলছিলাম, আকস্মিক ঘটনা শ্রবণে সাধারণ মনুষ্যের বুকের ভেতর ধরাস করে উঠলেও, সাধকের ক্ষেত্রে সেই চক্র চঞ্চল হয়ে ওঠে, যেখানে শক্তি অবস্থান করছে। আবারও প্রশ্ন, তবে সাধারণ মানুষের মূলাধার কেন চঞ্চল না হয়ে বুকের ভেতর ধাক্কা মারে? কারণটা খুবই সরল। হৃদয় রক্ত সঞ্চালন করে আর মূলাধারে শক্তি নিদ্রিত। তাই কোন আকস্মিক ঘটনা মস্তিষ্ক থেকে স্নায়ু দ্বারা সারা শরীরে ছড়িয়ে দেয়। ফলে ধাক্কা লাগে। কিন্তু মূল শক্তি জাগ্রত হলে মস্তিষ্কের দায়িত্ব কমে আসে। শরীর চালনা করা মস্তিষ্কের তখন একমাত্র কাজ। মূল শক্তি তখন মস্তিষ্ককে মহাবিশ্বের মূল শক্তির সাথে সংযুক্ত করতে চেষ্টা করে। এই শক্তি সহস্রদলে যা মস্তকে অবস্থান করে (কাল্পনিক ভাবনা), তার সাথে মিলিত হয়, তখন বুঝতে হবে সেই ব্যক্তি মহাবিশ্বের কেন্দ্রীয় শক্তির সাথে সংযুক্ত হল। এই অবস্থা স্থিতিশীল।

বিগ ক্রাঞ্চের সময় এটাই ঘটবে। প্রান্ত থেকে সমস্ত দেশ বা স্পেসকে আকর্ষণ করবে কেন্দ্রীয় শক্তি। স্পেস ছোট হবে আর সময় ও পদার্থ সংকুচিত হবে।

আবার ফিরে আসি পঞ্চনালে। এই পাঁচটা দলের ভিন্ন ভিন্ন শব্দ আছে।

শ- হলুদ বর্ণ।
ষ- চন্দ্রালোক বর্ণ।
স- কোটি বিদ্যুল্লতাকার বর্ণ।
ব- প্রকট এবং বিমূর্ত প্রকাশ। পলাশ ধূম্র বর্ণ।
কেন্দ্রে স্থিত লং। তেজ বা উত্তাপ।
এভাবে চৌষট্টি দলের চৌষট্টি বর্ণ।

"এক সো পদমা চৌসডী পাখুড়ী
তাই চড়ি নাচঅ ডোম্বী বাপুড়ী।।
"

এই পদ থেকে স্পষ্ট হয় যে ডোম্বীপা একজন সিদ্ধাচার্য। তিনি সহস্র দলে স্থিত হয়েছেন। ভুসুকুর রাজসর্প একটি রূপক। চিৎ কণা উর্ধ্বে উঠলে সমস্ত শরীরকে নাড়িয়ে দেয়। কী আশ্চর্য তার শক্তি। ভুসুকু এও বলেছেন গোড়াতেই তো অনু কণা ছিল না, এই জগৎ একটা ভ্রম। আর এই ভ্রম সত্য বলে প্রকাশ পায় তখন যখন সাধক চৌষট্টি দলে স্থিত হন, তখন জল মাটি বাতাস আলো বস্তু অবস্তু শূন্য বিস্তার বলে কিছুই থাকে না। থাকে শুধু অহম। বা সংস্কৃত ভাষায় আমি। অহম হল ওম। আর এই ওমকার ধ্বনি প্রকট হয় নাভি কেন্দ্রে। মনিপদ্মে। এবং তার পর শরীরের সমগ্র রোমকূপ থেকে শব্দ প্রকাশ পায়। বৌদ্ধ চিনা মন্ত্রে বলা হয় - ওম মনিপদ্মে হুং। অর্থাৎ ওম মনিপদ্মে স্থিত। আরও সহজ করে বললে আমি মনিপদ্মে আছি। এই আমি শরীর আত্মা ব্রহ্ম। আমার নিরন্তর পরিবর্তন হচ্ছে। এই সমগ্র মহাবিশ্বময় শুধু আমি আছি। বাকি সব কিছু ভ্রম।

এই কথাটাই তো বলেছেন মহান জ্ঞানী বিজ্ঞানীরা। অর্থাৎ m variable c = 0/1 রূট ওভার।

(সমাপ্ত)

চিত্র: লেখকের কাছ থেকে প্রাপ্ত।