
"সেই ধাবমান কাল, জড়ায়ে ধরেছে মোরে
ফেলি তার জাল,
কালের যাত্রায়, হে বন্ধু বিদায়।"
কবিগুরু রবি ঠাকুরের সঙ্গে আমাদের পরিচয় সেই কোন ছোটবেলা থেকে। যে কোনও শিক্ষিত বাঙালীর জীবনেই আজীবন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নায়, জীবন যন্ত্রনায়, সংগ্রামে, সব অবস্থাতেই মিশে আছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক প্রায় পারিবারিক। আর তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি, সেই 'শেষের কবিতা'! বাঙালী যৌবনের রোমান্সের সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। সতেরো আঠেরো বছরের ঘোর লাগা, রং লাগা মনে এই উপন্যাস, যা এক প্রেমের কাব্য, পড়লেই চমক লাগে - আরে, এ যে চিরকালের মানবহৃদয়ের উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসা! বিশ্ব, প্রকৃতি, দেশ ধর্ম সব কিছুকে অতিক্রম করে যাওয়া সে এক গভীর প্রেম। আশ্চর্য্য এক শক্তির জ্যোতি, আমাদের মুগ্ধ করে, আচ্ছন্ন করে।

সেই চিরদিনের যৌবনের গান 'শেষের কবিতা'র দেশ হলো এক মেঘেদের আবাসে, 'মেঘালয়ে'। কালিদাস বর্ণিত সেইসব আশ্চর্য অপরূপ মেঘদূতেরা ভেসে বেড়ায় সেখানে। যেন এলোকেশী অপ্সরার দল। সেই মেঘেদের রাজ্য হল শিলং।
"অমি তো বেছে বেছে শিলং পাহাড়ে গেল" - সেই অমিত যে নিবারণ চক্রবর্তীর ছদ্মনামে লিখেছিল -
"আনিলাম, অপরিচিতের নাম, ধরনীতে,
পরিচিত জনতার সরণিতে,
আমি আগন্তুক।"


শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি যাওয়ার এক আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, তার এক ধারে গভীর খাদ আর ঘন সবুজ অরণ্য। সেই পথে যেতে যেতে হঠাৎ এক দুর্ঘটনা! তাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল এক প্রেম কাহিনী।
"পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি, আমরা দুজনে চলতি হওয়ার পন্থী।"
সাধারণ গল্প কিন্তু অসাধারণ রচনা। রবীন্দ্র সাহিত্যের বৈশিষ্ট্যই তো তাই, বিন্দুতে সিন্ধু। তারপর, গল্প যখন শেষ হল তখন সেই শেষের কবিতাটি, "কালের যাত্রায়, হে বন্ধু বিদায়"। এই যে আকাশে মাটিতে মিলন হলো না, মাঝখানের সেই চিরবিরহের জায়গাটুকু মনকে বড় আকুল করে। এই 'শেষের কবিতা' কিন্তু কবির অল্পবয়সের উচ্ছল মনের লেখা নয়, বেশ পরিণত বয়সের রচনা। মানুষের অন্তর জগতের তোলপাড় মানসিকতার এক পরিণত উপলব্ধি।

১৯৬৮ সালে আমি প্রথম শিলং বেড়াতে যাই, তখন থেকেই তার সঙ্গে আমার গভীর প্রেম। এমন সৌভাগ্য আমার, যে দ্বিতীয়বার যখন গেলাম, তখন টানা ছয় বছরের জন্য বসবাস করতে গেলাম। সেটা ছিল ১৯৭৪ সাল। কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে গেলাম যে ভারতের এত সুন্দর পার্বত্য এলাকা থাকতেও কেন এই শিলং পাহাড়ের প্রেমে কবি ছিলেন এমন মশগুল। বারে বারে ছুটে ছুটে শিলঙেই গেছেন তিনি আর লিখে গেছেন তাঁর অজস্র কালজয়ী লেখা। এই জায়গাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল নিবিড় আর খুব ঘনিষ্ঠ।
শিলং মানেই হলো ক্যামেলিয়া, ম্যাগনোলিয়া আর পাইনের দীর্ঘশ্বাস। শিলং মানেই হলো মন কেমন করা বৃষ্টিঝরা দিন। আর শিলং মানেই হলো বিধাতার ক্লান্তিবিহীন ফুল ফোটানোর খেলা। এই শহরের আনাচে কানাচে যৌবন যেন থমকে থেমে আছে। সেই চিরযৌবনাকে না ভালোবেসে কেউ থাকতে পারে?
'শেষের কবিতা'র অমিতও তাই মনটাকে তার রেখে এসেছিল সেই শিলং পাহাড়ে।
আসলে বিশেষ কারুর সঙ্গে দেখলে, সেই দেখার বস্তু আরও দর্শনীয় হয়ে যায়।
(ক্রমশ)
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
আলোকচিত্রঃ লেখিকার কাছ থেকে প্রাপ্ত।
