ভারতের জাদু ও জাদুকরেরা

জাদুকর গনপতি চক্রবর্তী (১৮৫৮-১৯৩৯)
জন্ম: সালকিয়া, হাওড়া। পিতা শ্রী মহেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। পিতামহ শ্রী বেচারাম চক্রবর্তী, চাতরার দোরেপাড়ার (শ্রীরামপুর) জমিদার ছিলেন।
কলকাতার কাছেই বরানগরে জাদুকর গণপতির চক্রবর্তীর বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই তাঁর সার্কাস ও ম্যাজিকের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি কার কাছে ম্যাজিক শিখেছিলেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য জানা যায় না। তবে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে তখনকার জনপ্রিয় প্রফেসর বোসের সার্কাসেই ম্যাজিশিয়ান হিসেবে প্রথম পরিচিত হন।
পরে তিনি সার্কাস ছেড়ে নিজস্ব দল তৈরি করেন। জাদুকর ও অভিনেতা হিসেবে দেশের নানা জায়গায় ঘুরে তিনি প্রচুর প্রশংসা ও সাফল্য অর্জন করেন। তখন যেমন, এখনও মানুষ তাঁকে একজন জাদুকর হিসেবেই জানে।
তিনি খুব ভালো বাঁশি বাজাতে পারতেন এবং পাশাপাশি তবলা ও হারমোনিয়ামও ভালো বাজাতেন। যারা তাঁর জাদুর খেলা নিজের চোখে দেখেছেন, তারা আজও তা মনে করে বিস্মিত হন।
উনবিংশ শতাব্দীর ভারতে জাদুবিদ্যার জগতে জাদুকর গণপতি ছিলেন একজন পরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তি। নিজের চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে তিনি ভারতের প্রাচীন এই জাদুবিদ্যাকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
জাদুকর গণপতি জাদুকর সমাজে খুব সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। জাদুকরদের মধ্যে তিনি একজন প্রভাবশালী মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
আমাদের দেশে জাদু বহু শতাব্দী ধরে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। কিন্তু এদেশে ইসলাম আসার পর জাদু প্রদর্শন নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আর তাই জাদু লোকচক্ষুর আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। এরপর এলো ইংরেজ শাসন। অবস্থা আরও শোচনীয় হয়। জাদুকররা ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। এর প্রভাবে জাদুর রূপ ও ধরন ধীরে ধীরে পাল্টে যায়। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি বিনা তেলের যে প্রদীপটি জ্বেলেছিলেন, তারই ফলশ্রুতিতে আজ জাদু ও আমরা সবাই ক্রমশ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছি। ভাবতে অবাক লাগে, সেই দুর্দিনে গণপতি চক্রবর্তী এই শিল্পকে কাজে লাগিয়ে দেশ-বিদেশে ঘুরে অর্থ ও সম্মান অর্জন করেছিলেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জাদুকরদের জন্য একটি সুন্দর পথ তৈরি করেছিলেন।
তিনিই জাদুকে কুসংস্কার ও ভয়ের জগৎ থেকে বের করে ভদ্র ও সম্মানজনক শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। ভারতীয় সমাজে জাদুর মর্যাদা বাড়ানোই ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ্য।
এবার আসি তাঁর তাঁবুর ম্যাজিকের কথায়। পরনের কোর্টে মেডেল-এর মালা ঝুলিয়ে গোঁফযুক্ত মুখটি নিয়ে প্রতিদিন অনেক কিছুই দেখাতেন। কিন্তু মনে আছে, শুধু হাতকড়ি-পায়ের শেকল পরা মানুষটির কথা। এই খেলাটির নাম 'ইলিউশন বক্স'। শুরু হওয়ার আগে দর্শকদের দিয়ে বাক্সটি ভালো করে পরীক্ষা করানো হতো। তারপরই গণপতিকে হাত-পা শক্ত করে বেঁধে সেই বাক্সের ভেতরে ঢোকানো হতো। বাক্সটি চারদিক থেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে তালা লাগানো হতো। সামনে একটি মশারির মতো পর্দা টাঙিয়ে দেওয়া হতো। তারপর সংকেত পেলেই বাক্সের উপরে রাখা ঘন্টাটি তিনি বাজাতেন। শেষে ঘন্টা বাজাতে বাজাতেই বাইরে বেরিয়ে আসতেন সব বাঁধন খুলে।
আবার দর্শকদের দেওয়া রুমাল ও ঘড়ি নিয়ে ঢুকে গেলেন বাক্সের ভেতর, মশারির মধ্যে। এরপর সিন্দুক খুলতেই দেখা গেল, জাদুকর অদৃশ্য।

তার এইসব অলৌকিক ঘটনা দেখে দর্শকদের মনে হতো যে গণপতি তন্ত্রসিদ্ধ মানুষ। গণপতি দেবদেবীর ভক্ত হওয়াতে এই বিশ্বাস আরও বদ্ধমূল হয়েছিল লোকের কাছে।
আরেকটি খেলা ছিল 'ক্রস ইলিউশন'। এই খেলায় ক্রসের সঙ্গে তাঁকে শেকল, হাতকড়া ইত্যাদি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হতো। তারপর তাঁকে পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। এই অবস্থায় তাঁকে যে কোনো পোষাক ছুঁড়ে দেওয়া হলে গণপতি সেই পোশাকটি অনায়াসেই পরে ফেলতেন।

শোনা যায় তিনি শান্তিনিকেতনে এসে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও তাঁর জাদু দেখিয়েছিলেন। গণপতিকে প্রশংসা করে নবদ্বীপের তৎকালীন পন্ডিত সমাজ তাঁকে 'যাদুবিদ্যা বিশারদ' উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়া লর্ড কারমাইকেল, কাশিমবাজারের ছোটলাট বেকার সাহেব, বর্ধমানের জমিদার হরেকৃষ্ণ দে প্রমুখরাও তাঁকে উপযুক্ত সন্মান ও পুরস্কার দিয়ে সন্মানিত করেছিলেন। বাংলা ভাষায় 'যাদুবিদ্যা' নামে একটি জনপ্রিয় বইও তিনি লিখেছিলেন।

গণপতি ছিলেন অকৃতদার। কলকাতার একজন দক্ষ শিল্পী ও সাধকসুলভ মানুষ। দু'হাতে টাকা যেমন রোজগার করেছেন তেমনি দানও করে গেছেন অকাতরে। পরবর্তীকালে নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে কলকাতার বরানগরে একটি কালী মন্দির স্থাপন করেন। জীবনের শেষদিকে তিনি সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন। এই মন্দিরেই ৮১ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
(ক্রমশ)
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
