বিবিধ

দুটি মুক্তগদ্য



অভিজিৎ রায়


(১)

একুশে ফেব্রুয়ারি, বাঙালি ও ক্ষুদিরাম

আর কতদিন ফেব্রুয়ারি এলেই বাঙালি গেয়ে উঠবে "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি"? আর কত দিন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে এসে পৌঁছালাম রবীন্দ্রনাথ, নজরুল হয়ে ক্ষুদিরামের কাছে। বাঙালির বাংলা ভাষার প্রতি প্রেমের মানদন্ড বোধহয় এঁরাই এই মুহূর্তে নির্ধারণ করে দিতে পারেন। বাঙালির ঐতিহ্য নির্ধারিত করে ফেলতে যেমন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এবং বিদ্রোহী কবি নজরুল গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ স্কুললাইফ, কলেজলাইফ কিম্বা অফিস লাইফে আধুনিক বাঙালির নিজেকে ক্ষুদিরামের সঙ্গে তুলনা করার প্রয়াস। সমাজ বা দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করাকে বাঙালি এখন বোকামি ভাবে এবং সেই অর্থে তারা বেছে নিয়েছে ক্ষুদিরাম শব্দটিকেই। এরপর বাংলা ভাষার অপমৃত্যুর আর কীই বা বাকি থাকে?

ভাষাদিবস এলেই বাঙালি পিলপিল করে রাস্তার শোভাযাত্রায় হাঁটতে শুরু করে। কবিতা আবৃত্তি থেকে রবীন্দ্রসংগীত এবং সর্বোপরি "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি" গাইতে গাইতে; আবুল, বরকত, জব্বারদের শহীদ হবার বক্তৃতা শুনে রক্ত গরম করে বাড়ি ফেরার পথে দোকানে ঠাণ্ডা পানীয় কেনার সময় ছেলে বা মেয়েকে বারংবার বোঝাতে থাকে পঁয়তাল্লিশ মানে ফর্টি ফাইভ। আসলে বাঙালি এখন বাংলা ভাষার জন্য গান গাইলেও তার অভিমান এখন ছেলে বা মেয়ের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষায় বন্দি হয়ে পড়েছে।

অনেকেই বলেন, ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের কথায়। যতদিন মানুষ তার কথায় বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করবেন ততদিন নাকি বাংলা ভাষার মৃত্যু হবে না! সত্যিই কি তাই? বাঙালি কি এখন সত্যিই বাংলা ভাষায় কথা বলছে? মফসসলের উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত বাঙালি ছেলেরা যেমন উচ্চশিক্ষিত হতে ভিনরাজ্যে পাড়ি জমিয়েছে, তেমনই এই বাংলার নিম্নবিত্ত এবং গরীব ছেলেরা কাজের খোঁজে পাড়ি দিয়েছে এই দেশেরই ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যে। কাজেই উচ্চশিক্ষিতের বাংলা ভাষায় যেমন ঢুকে পড়ছে বহুলাংশে ইংরাজি এবং হিন্দি, তেমনই পরিযায়ী শ্রমিকের বাংলা ভাষায় দারুণভাবে অনুপ্রবেশ করেছে হিন্দি। আর এই মিশ্র বাংলা ভাষার জনক-জননীদের একাংশ বাঙালির আভিজাত্য বজায় রাখতে ভাষাদিবসের অনুষ্ঠানের নামে একদিনের অবসর‍যাপন করছেন অনায়াসে। মূল সমস্যার ভিতরে না ঢুকে প্রতিনিয়ত বাংলা ভাষার দফারফা করে দিয়ে সেই ভাষাকে নিয়েই নাচানাচির সুযোগ খুঁজছেন ফেব্রুয়ারি এলেই।

এই একই সময়ে বাঙালির প্রেমিক অথবা প্রেমিকা সত্তা জেগে ওঠে একটু বাড়াবাড়ি রকমভাবে। তাই বসন্তপঞ্চমী অর্থাৎ বাঙালির প্রেমদিবস, তারপর ভ্যালেন্টাইন-ডে অর্থাৎ কর্পোরেট প্রেমের দিন এবং তারপরেই একুশে ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ কিনা ভাষা প্রেমের দিনে ডুবে যাওয়া বাঙালি কিন্তু ভাষা দিবসের সেই আত্মত্যাগ বা আন্দোলনের কথা ভুলে গিয়েই দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে একুশের বইমেলা, রবীন্দ্রনাথ, বোলপুর, শান্তিনিকেতন আর বিশ্বভারতী নিয়ে।

আর কতদিন বাঙালি তার ইতিহাস ভাঙিয়ে খাবে? সেই ইতিহাস যার অধিকাংশই বাঙালি বিস্মৃত হয়েছে পুরোপুরি অথবা আংশিক!

(২)

ডিগবাজি তোমার নাম আলিমুদ্দিন

ঝুপ করে ঝাঁপ দিলেন সেলিম। উদ্দেশ্য ছিল "জুপ"-এর মন বুঝে গাঁটছড়া বাঁধার অথবা আসন সমঝোতা করার! কী অদ্ভুত দায় ক্ষমতা দখলের লালসার। নীতি নৈতিকতার ধার ধারে না যে বামপন্থা, তার কাছে কি আমরা ডানপন্থার পাঠ নিতে যাব?

মানুষ, সমাজ যেখানে পচে গেছে গত ৩৪+১৫ বছরে, যেখানে সিপিএমের ৩৪ বছরে সাধারণ মানুষ বামপন্থা সম্বন্ধে অশিক্ষিত থেকে গেছে, সেখানে সিপিএম কখনও আই.এস.এফ. অথবা কখনও জেইউপি'র সঙ্গে আঁতাতে মন দেবে এবং গ্রামগঞ্জের মানুষ ক্ষমতার হাত বদলের সঙ্গে সঙ্গে সিপিএম ছেড়ে তৃণমূলে নাম লেখাবে, তাতে আর আশ্চর্য কী?

কাঁঠালের আমসত্ত্ব খাওয়া বাঙালি আর আমসত্ত্বের স্বাদ পেতে চায় না। ভিক্ষার চাল, আলু নিয়েই সে সন্তুষ্ট হতে শিখে গেছে। কাজেই সেলিম, হুমায়ূন বৈঠকে সিপিএম শূন্য থেকে মাইনাসে ঢুকবে কিনা এ নিয়ে আলোচনার চেয়েও বাঙালি এখন জেল ফেরত পার্থবাবু, অর্পিতার জন্য মনখারাপ করে কিনা সেটা জানাই লক্ষ্য।

যদিও সখ্যতা আর লক্ষ্যটা বদলে যেতে যেতে সম্ভাবনার শিল্প ক্রমশ অসম্ভব এক অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি করছে। যদিও ভারতের AQI নিয়ে মোটেও ভাবতে রাজি নয় ভারত সরকার।

তাহলে দেখা যাচ্ছে বিজেপির সঙ্গে সিপিএম এর পরিবেশগত ফারাক কমে আসছে। আর নীতি-নৈতিকতার বাধ্যবাধকতা থেকে বেরিয়ে আসা বামপন্থা কি তবে বিজেপির সঙ্গে জোটে আগ্রহী হবে এই সম্ভাবনার শিল্পে? যদিও এ ছাড়া তৃণমূল উৎখাতের অন্য কোনও উপায় নেই। না বিজেপির, না সিপিএমের। এখন প্রশ্ন হচ্ছে উপায় না থাকা আর ইচ্ছে না থাকার মিল আর মিলনের মঞ্চ তৈরি হচ্ছে কি?

চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।