[একজন সৃষ্টিশীল মানুষ একদিন স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান। প্রাত্যহিক জীবনের দ্বিধা দ্বন্দ্বে জীর্ণ জীবনকে এক নতুন রসের ধারায় নিজেকে সিক্ত করতে তার এই স্বেচ্ছানির্বাসন নাকি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে তা তিনি নিজেও জানেন না। অথচ তার এই নির্বাসনকালে তার জীবন ও লেখা বাঁক নেয় এক নতুন পথে। নিজের সৃষ্টিকে নতুন করে তিনি কি গ্রহণ করতে পারবেন নাকি বিসর্জন দেবেন অবসাদের গভীর অন্ধকারে? এই টানাপোড়েন নিয়েই লেখা অভিজিৎ রায়ের এই নতুন উপন্যাস "নিখোঁজ কবির ডায়েরি"।]
(চোদ্দ)
'আরে! অর্ণব যে! কী মনে করে? কতদিন তোকে দেখিনি বল তো। কী করছিস এখন?' অঞ্জনা সোফার উপর অফিসের ব্যাগ রেখে বসতে বসতে বলল।
ট্রে-র উপর ধূমায়িত কফির কাপ সাজিয়ে রান্নাঘর থেকে ঢুকতে ঢুকতে সোহিনী হাসতে হাসতে বলল, 'তোমাকে কেমন সারপ্রাইজ দিলাম বল?'
অর্ণব বলল, 'আর বোলো না মাসি, এমন অফিসে কাজ নিয়েছি যে ছুটি বলতে কিছুই নেই। আজ সোহিনী কলেজের পাড়ায় গিয়েছিলাম একটা কাজে। সেখানেই ওর সঙ্গে দেখা। আর, ব্যস আমাকে নাকি তক্ষুনি বাড়ি আসতে হবে। অনেক মানিয়ে কাজ সেরে তারপর এলাম। আমার জন্য বেচারিকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে কলেজগেটে অনেকক্ষণ।'
- তা তুই এখন কী করছিস রে?
একটা প্রাইভেট ইনভেস্টিগেশন ফার্মে চাকরি।
- 'মানে? ডিটেকটিভ? অর্ণব তুই ডিটেকটিভ।' অঞ্জনা হাসতে থাকল। অনেকদিন পর মাকে হাসতে দেখে সোহিনী খুব খুশি হল মনে মনে।
তাহলেই বোঝ মা। হাবাগোবা অর্ণব দাদা এখন টিকটিকি।
- না, মাসি। আমি এখনও সেরকম কিছু না। মাঝে মধ্যে বস যা বলেন তারই খোঁজ খবর এনে দিই। এই আর কী? সোহিনীর কাছে সব শুনলাম। মেসোর ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং। আমি কি ব্যাপারটা হাতে নেব? বসের সঙ্গে আলোচনা করব? তুমি কি চাইছ এরকম কিছু?
অঞ্জনা সোহিনীর দিকে তাকাল। যেন জিজ্ঞেস করল, সোহিনীর মতামত। সোহিনী বলল, 'আমরা এখনও এ ব্যাপারে তো সেরকম কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি অর্ণবদা। তুমি কী বলছ বল?'
- 'যদি পুলিশ প্রশাসনের সাহায্য না নাও তাহলে কিন্তু অন্য পথ বেছে নিতে হবে। তা যদি এখন নাও ভাল আর যদি আরও দু-একদিন অপেক্ষা করতে চাও মেসো ফিরে আসার তাও দেখে নিতে পারো।'
- ঠিক আছে বাবা, তুই নিজের মতো করে আগে তোর বসের সাথে কথা বল।
তারপর আমাকে জানা। তারপর আমি দেখছি। কফি খা। আর কী খাবি বল। আমি বানাচ্ছি। লুচি তরকারি বানিয়ে দিই। তোর বাবা, মা কেমন আছে রে?
- মা আর তুমি মোটেও ভাল বন্ধু নও অনু মাসি। কতদিন হয়ে গেল বল তো। কোনো যোগাযোগ নেই। সেই যে আমাদের পাড়া থেকে চলে এলে ব্যস্ আর যোগাযোগ নেই। বাবা তো এখন ক্যানসার পেশেন্ট আর মা ক্রমশ মানসিক রোগী। আমার তো ইচ্ছে ছিল কেমিস্ট্রি নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি করি কিন্তু বাড়ির চাপের জন্য হল না। বাবাদের অফিসেরই এক কলিগের ছেলের অফিসে কাজ করি। মাইনেটা ভাল তাই এত ওষুধপত্র আর কেমোর খরচ চালিয়ে বেঁচে আছি।
অঞ্জনা মুখ নিচু করে শোনে। তারপর বলে, সত্যি আমি খুব খারাপ বন্ধু রে। আমার খবর নেওয়া উচিত ছিল অঞ্জলির, সোমনাথদার। আমি যাব একদিন এর মধ্যে। সোমনাথদাকে দেখতে। যাব একদিন। দাঁড়া তোর জন্য লুচি করে আনি।
- না, অনুমাসি। দরকার নেই। আমরা রাস্তাতেই ফিস কাটলেট আর কাবাব খেয়েছি। ফুল লোড। পরে একদিন রবিবার করে এসে তোমার হাতের ইলিশ পাতুড়ি খেয়ে যাব।
অঞ্জনার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। মাঝে যে কত কী হয়ে গেল তার জীবনে। সব এলোমেলো হয়ে গেল। সেই মেয়েবেলার বন্ধু অঞ্জলি। কলেজের প্রথম দিনের আলাপ। অথচ এখনও সব পরিস্কার হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল। অর্ণবের পাশে উঠে গিয়ে মাথায় পিঠে হাত বোলাতে লাগল অঞ্জনা। বুঝতে পারল ছেলেটা মায়ের স্নেহস্পর্শ থেকে বঞ্চিত অনেকদিন।
অনু মাসি, মেসোর লেখার জায়গা আর খাতাপত্র কি আমি একবার দেখতে পারি? আর মেসোর ফোন নাম্বারটা দাও। ওটাও আমার দরকার।
- বাবার ফোন তো সেদিন বিকেল থেকে বন্ধ। নতুন নাম্বার নিয়েছে কিনা জানি না। বাবার বন্ধুদের ফোন করে কোনও হদিস মেলেনি।
- ঠিক আছে। তুই মেসোর বন্ধু আর পরিচিত কাজের লোকদের একটা লিস্ট করে মোবাইল নাম্বার সহ আমাকে দে। মেসোর আধার কার্ডের নাম্বারটা আমাকে হোয়াটস্ অ্যাপে দিবি। আমি দেখছি তারপর।
অঞ্জনা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে অর্ণবের দিকে। কত বড় হয়ে গেছে ছেলেটা। বেশ ম্যাচিওরডও হয়েছে। ওকে জন্মাতে দেখেছে। আজ সে কত বড় হয়ে গেছে। সোহিনীর দিকে তাকিয়ে বলল, 'দেখ, দেখে শেখ। কীভাবে ম্যাচিওরড হতে হয়। ওর উপর দিয়ে কম ঝড় গেছে। তবু কত শান্ত। তুই তো একটুতেই ভেঙে পড়িস।'
ওসব ভেবো না মাসি। সোহিনীও বেশ ম্যাচিওরড। আর দু-এক বছরে ও ঠিক সব সামলে নিতে পারবে। আমার তো তাই মনে হয় অন্তত। তা তুমি কবে আসছ বল আমাদের বাড়িতে?
- পরশু রবিবার। উদিন বিকেলে যাব না হয়। তুই তোর মাকে এখনই কিছু বলিস না। তবে আমি যে যাব সেটা ফাইনাল। কি রে সোহিনী, তোর কোনও প্রব্লেম নেই তো? - না, না। কোনও চিন্তা নেই। আমিই যাব তোমাকে নিয়ে।
অর্ণব বেরিয়ে যাবার পর থেকে অঞ্জনা নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। সোহিনী একবার ঘরে এল বটে কিন্তু মা বিশ্রাম নিচ্ছে দেখে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। অঞ্জনা ঘুমানোর চেষ্টা করছিল কিন্তু পারছিল না। মাথাটা খুব ব্যথা করছে। গত রাতে সারারাত সে সৃজিতের ফোনে ট্রাই করে গেছে। ভেবেছিল, সৃজিত হয়তো রাতে ফোন সুইচ-অন করে কারোর কারোর সাথে যোগাযোগ রাখছে। কিন্তু না। কাল সারারাত সৃজিতকে ধরেছুঁয়ে পায়নি অঞ্জনা। এইসব ভাবতে ভাবতে মোচড় খেল ভাবনা। সে কি সত্যিই কোনোদিন সৃজিতকে ধরেছুঁয়ে পেয়েছিল? শরীরকে কাছে পাওয়াই কি সব? দু'জনের জগতকে দু'জন কীভাবে যেন দূরে দূরে সরিয়ে রেখে নিজেদের একসঙ্গে থাকার অভিনয় করছিল! আজ ভাবতে গেলে অবাক হতে হয়। সাংসারিক জ্ঞান বিন্দুমাত্র না থাকায় সৃজিত যে কতভাবে সংসারকে বিপদে ফেলেছে তা একমাত্র অঞ্জনাই জানে। সোহিনী বড় হবার সাথে সাথে কিছুটা বুঝতে পারছিল কিন্তু এক অদ্ভুত টান ছিল ওর বাবার প্রতি। মাঝেমাঝে অঞ্জনা সেই টানকেও ঈর্ষা করত বোধহয়। সারাক্ষণ মেয়ের পিছনে সময় যেত অঞ্জনার। অফিসের বাইরে যতটুকু সময় তার সবটাই সে ঢেলে দিল সোহিনীকে অথচ মেয়ের প্রাণ বাবার জন্য কাঁদত। কিন্তু, বাবা তো শুধু তার কাজ নিয়েই ব্যস্ত। কখনও সখনও মেয়ের পছন্দসই খাবার নিয়ে বাড়ি ঢুকতো অথবা মেয়ে বললে, অর্ডার দিয়ে আনাত বাড়িতে। ব্যস্ ওই পর্যন্তই। অথচ, অঞ্জনাকে গঞ্জনা সহ্য করতে হতো। সৃজিত মাঝেমধ্যেই রেগে গিয়ে বলত অঞ্জনাই নাকি সৃজিতের কাছ থেকে সোহিনীকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এখন কে দূরে নিয়ে গেল কাকে সৃজিত? ফাঁকা ঘরে কাকে প্রশ্ন করল অঞ্জনা? না, সে জানে না। দু'ফোঁটা জল চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল বালিশে।
অর্ণবের কাজের সুবিধার জন্য সোহিনী বাবার ব্যক্তিগত পরিচিতের নাম ও ফোন নাম্বারের লিস্ট তৈরি করে মায়ের ঘরে ঢুকতেই কান্নার গন্ধ পেল। উচ্ছাস সংযত করে চুপ করে মায়ের গায়ে হাত রাখল। আস্তে আস্তে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, চা খাবে? আমি চা করে আনছি। তুমি ফ্রেস হয়ে নাও। আজ আমরা দুজনে একটু বের হব। অঞ্জনা মেয়েকে জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না যে সে কোথায় যেতে চায়। হয়তো সবাইকেই কোনো না কোনো অদরকারী কাজ করতে হয় কোনো না কোনো সময়। যে ভুল সৃজিত করেছে সেই ভুল করার ক্ষমতা কি অঞ্জনার আছে? সে তো অসাধারণ নয়, সাধারণ; অতি সাধারণ!
(ক্রমশ)
