গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

মেরা নাম ব্রোকার (তৃতীয় পর্ব) [ধারাবাহিক উপন্যাস]



শমীক গোস্বামী


।। ভূমিকা ।।

[বাংলা উপন্যাসের এরকম হিন্দি নামকরণের কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে যদি পুরোটা একটু ধৈর্য্য ধরে পড়া যায়। বস্তুত এর থেকে জুতসই নাম হয়তো আর দেওয়া যেতে পারত না। এখন গল্পটা কেন লেখা হল তার প্রেক্ষাপটটাও একটু খতিয়েও দেখা দরকার। আমি নিশ্চিত যে হয়তো এই একই সময়ে পৃথিবীর কোনো না কোনো মানুষ এ বিষয় নিয়ে ভাবছেন, লিখেও ফেলছেন বা ফেলবেন খুব শিগগিরি। কারণ বিষয়টা নিয়ে লেখা দরকার। যেসব অর্থনৈতিক ঘোটালা অহরহ ঘটেই চলেছে দেশজুড়ে দুনিয়াজুড়ে আমরা যেগুলোর ভুক্তভোগী হচ্ছি আর কিছু করার নেই বলে পাশ কাটিয়ে চলেও যাচ্ছি, অল্পদিনে বুকে খচখচানি নিয়ে ভুলেও যাচ্ছি সেসব, আমি আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি সেই 'ভুলে যাওয়া'গুলোর ওপরেই।

রাষ্ট্র 'এগুলো' আমাদের বেমালুম ভুলে যাওয়ার কথাই বলে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনের হাতিয়ার হিসেবে এইসব ভুলে যাওয়াগুলোকে ইচ্ছেমতো সুবিধেমতো কেচ্ছা বানায় বা ইস্যু বানায়! স্বাধীনতার পর থেকে এখন অবধি যে পরিমাণ আর্থিক দুনীর্তি হয়েছে তার সিকিভাগও জনতার পকেটে আর ফেরৎ আসেনি। এটাই বাস্তব! আর এখান থেকেই শুরু আমার গল্পের!

এই উপন্যাসের আলাদা করে কোনো পাত্র-পাত্রী নেই ইচ্ছে করেই করা হয়নি কারণ গোটা উপন্যাসটিকেই একটা 'চরিত্র' বানানোর সচেতন প্রচেষ্টা করে গেছি। টুকরো টুকরো চরিত্রের ছবি ফোটানোর চেষ্টা করেছি আর সেইগুলোর আর পুনরাবৃত্তি করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করিনি। তবে চরিত্রগুলোর সমন্বয়ে একটা গল্প বলার চেষ্টা করেছি। কোনো চরিত্রকে পূর্ণতা দেবারও চেষ্টা করিনি। এটা একটা সচেতন ভাবে করা নিরীক্ষা। বাকিটা আপনাদের ওপর। প্রতিবারের মতো এবারও মুখিয়ে থাকব প্রতিক্রিয়ার জন্য।]

।। রহিম শেখ ।।

"অ্যায় জিন্দগী, যাঁহা ছোড়কে গয়ি তু,
ওঁহি সে তেরা জন্নত শুরু হুয়ি হ্যায় -
মউত নেহি জিন্দা রাখা অবতক
উসিনে হি তো সাহারা হুয়ি হ্যায়।
"

আবার একটা গজলের রাত নেমে আসছে ছাতে। রহিমের পৌ কাজু-বাদামের পাত্রে। জানে রহিম, গজল এখন পুরোপুরি তার নশা ছড়াতে - একটু একটু করে ওর বাহুডোরে ধরা দেবে আকাশ থেকে নেমে আসা নান নানান মোচড়। সুরের সঙ্গে কথার মুঠভেড়ে কখন একাত্ম হয়ে যাবে সে।

তেতলায় ওর ঘরের বাইরের একটা বিশাল ছাত। ওর নসিবে আল্লাতালা ঘন দেননি ঠিকই কিন্তু এতবড় একটা ছাত দিয়েছেন, আকাশ দিয়েছেন। বাইপাসের ওপরের ফ্লাইওভারে গাড়িগুলোর চলন্ত-আলোর সারি দেখতে পাচ্ছে রহিম...

...তালা হ্যালোজেন...

আলোগুলো আর উদার আকাশের তলায় দাঁড়িয়ে ওর মনে হচ্ছে সত্যিই তো যখন ভেবেছিল ওর জীবন শেষ হয়ে গেল, তখনই যেন আবার শুরু হল! এটাই তো এখন জন্নত, বেহেস্ত ওর।

নিকিতা ওকে ছেড়ে চলে যাবার পর তিনটে দিন তিনটে রাত ঘুমুতে পারেনি ও।

একটা গুমোট মৃত্যু আচ্ছন্ন করেছিল ওকে। নিকিতা ওকে ছাড়তে পারে কখনো, খোয়াবেও ভাবে নি রহিম। অথচ বিয়ের পর তিনটে বছরের প্রত্যেকটা দিনই প্রায় মধুযামিনীর মতো পালন করেছে ওরা। রহিম আনোয়ার শেখ আর নিকিতা যোশেফ।

দুজনেরই পরিবারের অমতে বিয়ে। বিয়ের পর বাইপাসের ধারে তেতলাতে ওদের এই সুখের নীড়। মাথার ওপর ফল্স সিলিংওলা অ্যাসবেটাসের ছাত দুটো ঘর, বাথরুম আর কিচেন আর সামনের ওই এত্তটা ছাত!

"রাহি ডালিং জাষ্ট অসাম এই ঘরটা, এই ছাতটা, এই জায়গাটা", জড়িয়ে ধরে নিকিতা গাঢ় চুমু খেয়েছিল ওকে। "আমি খুব খুশি, দেখো একে আমি হেভেন বানিয়েই ছাড়বো।"

আজ ঘরের ভেতর থেকে বোসের সাউন্ড সিস্টেমের থেকে বেরিয়ে আসা একেকটা সুরের স্পর্শে মনে হতে লাগলো রহিমের সত্যিই তো হেভেনেই দাঁড়িয়ে আছে ও। তবে অকেলা।

মাথায় অ্যাসবেসটাসের চাল হলেও অল্প দিনেই আস্তে আস্তে জরুরী জিনিসপত্র এনে বসিয়েছিল দুজনেই। একটা ফ্যাশান ডিজাইনিং কোম্পানীতে ডিজাইনারের কাজ করতো নিকিতা। সরোজীনি টাওয়ার্সের সিকিউরিটি সার্ভিসের পয়লা নম্বরের অফিসার ছিল রহিম। বসের পারসোনাল বডিগার্ড তখনো হয়নি।

টিভি, ফ্রিজ, দুটো এসি, মাইক্রোওভেন, মিউজিক সিস্টেম সব মিলিয়ে ছোট্ট একটা গোছানো 'শেপ' এ চলে এসেছিল আস্তানাটা। বাড়িটার বাইরে থেকে দেখলে কিন্তু মনেই হবে না যে তেতলায় এরকম সুন্দর গোছানো এক টুকরো গেরস্থালী থাকতে পারে। তার থেকেও যত্নে গোটা ছাতটাকে সাজিয়েছিল নিকিতা।

পাঁচিলে ম্যাচিং রড, সুন্দর এল.ই.ডি ল্যাম্প, টবের সারি, ফুলের কেয়ারি একটা ছোট্ট রট আয়রনের দোলনা সব নিজে হাতে করেছিল। সাউন্ড সিস্টেম ঘরে থাকলেও ঘর আর ছাতের কর্ণারগুলোতে লুকোনো বক্স ফিট করিয়েছিল ও মাঝে মাঝেই 'মেহফিল' বসতো এখানে। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে। সরোজীনি স্ট্রীটের সঙ্গে রহিমেরও তারাক্কি হচ্ছিল জলদি।

মেহমানরা চমকে যেত এখানে এসে। এত কম ভাড়ায় - এরকম একটা জায়গায় - যেখানে থেকে বাইপাস জাস্ট দুমিনিটও নয় - তাতে চমকানোই উচিৎ। প্রশান্ত তো একদিন নেশার ঘোরে বলেই দিল রশিদকে "দ্যাখ ঢপ দিস না তো ইকবালচাচা না কি, এত্ত কম মালে এই জায়গাটা তোকে দিয়েদিল?" তোরই নেহাৎ মদ খেয়ে মাতলামি একেবারেই পছন্দ করে না রহিম তাই বাওয়ালটা আর বাড়ায়নি সেরাতে। কিন্তু কাছের বন্ধুরা যে একটু ঈর্যান্বিত সেদিন থেকেই বুঝতে পেরেছিল ও। নিকিতাও।

সবাই চলে যাবার পর সিঙ্কে এঁটো গ্লাস ধুতে ধুতে বলেছিল ওকে, "দ্যাখো মানুষ কেমন বদলে যায় যে আরতি তোমার আমার বিয়ের রেজিস্ট্রেশান থেকে শুরু করে ঘরকন্নার শুরু করার প্রায় প্রতিটি মুহুর্তেই আমাদের সঙ্গে ছিল - আজকে খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করল রহিমের প্রচুর উপরি আমদানী আছে না রে? নয়তো একদিনে এতসব অ্যাফোর্ড করল কি করে খুব একটা অ্যাফ্লুয়েন্ট ঘরের ছেলে নয় তোও?"

মদের গ্লাসটা শেষ করল রহিম। গ্লাস ভরল। আইস দিল। দোলনাটায় আর বসে না ও। নিকিতা আট মাস সতেরো দিন হল এই স্বর্গের মালিকানা ওর হাতে দিয়ে চলে গেছে।

সত্যিই নিতান্ত মামুলি ঘরের ছেলে ও। বাবার টেলারিং এর ছোট্ট দোকান ছিল বেনেপুকুরে। তার চার ভাই দুই বোন নানা, নানি নিয়ে বিরাট সংসার। থার্ড হল ও। ওরপর আসলাম আর দুই বোন নাফিসা আর তাবাসুম। পিঠোপিঠি। ওর দুই বোনকেই ইংলিশ পড়াতে আসতো নিকিতা। তখন কতইবা হবে নিকিতার বয়েস। আঠারো? নাকি উনিশ!

মেয়ে তো নয় যেন আগুন! সপ্তাহে যে কদিন আসতো ওদের বাড়ি টিউশানিতে সারা পাড়া যেন ওঁত পেতে থাকত। গলিতে, ধাপিতে, বারান্দায়, বেঞ্চিতে। ঠাঠও ছিল সাংঘাতিক। টাইট জিন্স আর ম্যাচিং টপ পড়ে পনিটেল বেঁধে যখন আসতো নিকিতা তখন গোটা পাড়া সহ আকাশটাও যেন বলতো ক্যায়া বাত হ্যায়? ক্যায়া অদা হ্যায়! আব্বা - মানে মেহবুব আলম এমনিতে খিটখিটে হলেও ছেলেমেয়েদের পড়াশুনোর ব্যাপারে কার্পন্য করেন নি কখনোই। হিজাব, বুরখা পড়লেও মেয়েরা পড়াশুনোর আলো থেকে বঞ্চিত হয় - চাননি একেবারেই। তাই প্রথম দুই ভাই সেরকম শিক্ষিত না হলেও রহিম, আসলাম আর বোনেরা পড়াশুনো চালিয়ে গেছে। নাফিসা তো কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা উৎরে এখন একটা কলেজে অধ্যাপনা করে। ইংরিজি সাহিত্য নিয়ে। আর তাবাসুমও চাকরি করছে। আসলাম কানপুরে নিজের একটা পোলট্রি ফার্ম খুলেছে। ওর শ্বশুরবাড়িও ওখানেই।

নিকিতার সঙ্গে বিয়ের সময়ই সব সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল রহিম। তবে নিকিতাই সব খবর দিত ওকে। নাফিসা ওর বর ইসমাইলের। আসলাম মাঝে মাঝে ফোন করত নিকিতাকে। নিকিতা ওকে, ওর বউকে। তাবাসুম একটা ছেলের প্রেমে পড়েছিল। ছেলেটি হিন্দু। কিন্তু সেটা আর দানা বাঁধেনি। আজ পর্যন্ত 'তাব্বু' আর বিয়ে করেনি।

"দিল-এ-নাদান কিউ ধরকতা হ্যায় তু, সোচ মত আভি তো শ্বাসে বাকি হ্যায় -"

নিকিতা ওকে হুট করে এমন ছেড়ে দেবে ভাবেনি রহিম। ততদিনে আচমকাই অফিসে বিদিশার সঙ্গে ও জড়িয়ে পড়েছিল। নিকিতা কি বুঝতে পেরেছিল আন্দাজ করেছিল কিছু? কোন ঝগড়া না করে, কিছু না বলেই এমনভাবে ভালবাসার এই জন্নত ভেঙ্গে চুরমার করে চলে গেল কেন?

"শোন, অনেকদিন ধরেই ভাবছি তোমায় বলবো - কিন্তু বলা হচ্ছিল না!"

"কি বলে ফ্যালো!" দাড়ি কাটতে কাটতে বলেছিল রহিম সেদিন সকালে।

"আমি চলে যাচ্ছি!" ওর দিকে তাকিয়ে বলেছিল নিকিতা।

"কোথায়, ট্যুরে? অ-কদ্দিনের জন্য?"

নিকিতা মাঝে মাঝে ট্যুরে যেত। দিল্লী, বাঙ্গালোর, মুম্বাই। দু চারবার বিদেশে গেছে। সিঙ্গাপুর, প্যারিস, থাইল্যান্ড অফিসের কাজে, নানান ইভেন্টে।

"হুঁ - তবে অনেক লম্বা"

"আচ্ছা - কদিনের?" বাঁ গাল কেটে ডানদিকে রেজার দিয়েছে তখন রহিম।

"ফর গুড - ফর এভার!"

"হাঁ - গুড ওয়ান - হোয়াট আ জোক!"

"না রাহি - আয়াম সিওর - দ্যাখো আমি সকাল থেকে সব কিছু প্যাক করে রেডি হয়েই আছি - জাস্ট ওয়েটিং ফর ইয়োর কনসেন্ট!"

মুখ ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে একটু অবাক চোখে তাকিয়েছে রহিম।

"ইউ বিচ্ - নতুন কোন ট্রিক হচ্ছে নাকি" হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরেছে ও নিকিতাকে "কই কালরাতে তো কিছু বলো নি আমায় ডার্লিং?"

"কাল রাতে আমরা একে অপরকে এনজয় করছিলাম তাই বলিনি একচুয়ালি - আই হ্যাভ মেড আপ মাই মাইন্ড আ মান্থ ব্যাক - বাট তোমায় বলিনি, বলতে পারিনি হয়তো।" ওর হাত ছাড়িয়ে বলেছিল নিকিতা।

"আচ্ছা, আচ্ছা ভাই সরি সরি - চলো আজ আমি আর তুমি দুজনেই অফিস বাঙ্ক - লেটস্ স্টার্ট মাই বাইক এ্যান পেইন্ট দ্য সিটি ব্ল‍্যাক" ব্যাপারটা সিরিয়াস বুঝেই হাল্কা করার চেষ্টা চালিয়েছে রহিম" কোন ভাল জায়গায় লাঞ্চ - তারপর সিনেমা - সন্ধ্যাবেলায় - সব্বাইকে ডেকে রুফ টপ পার্টি - আচ্ছা বেশ! শুধু তুমি আর আমি - ক্যান্ডললাইট ডিনার তারপর রাতে আবার... হানিমুন... নাও হ্যাপ্পি?"

"নাও হ্যাপ্পি?" এ কথাটাই তখন প্রতিধ্বনির মতো দুকানে বাজছে রহিমের। গজলের ওই রাতে। গ্লাসের ছলকানিতে চেয়ারের ওপরে রাখা মোবাইলের দিকে হঠাৎ চোখ গেল রহিমের হঠাৎ। ও হো! সাইলেন্ট করা ছিল। সাতটা মিস্ড কল। দুটো বসের। তিনটে বিদিশার। একটা নীলিমার আর একটা আননোন।

চারটে হোয়াট্স অ্যাপ। দুটো দুই মহিলার। একটা এসএমএস। ওই আননোন নাম্বার থেকে। সেটাই চেক করলো আগে রহিম।

কেন 'হ্যাপি' হয়নি নিকিতা? কেন কোন অভিযোগ করল না ও আর বিদিশার সম্পর্ক নিয়ে? সবটা ভেবেছিল কি? কিভাবে জড়ালো ও বিদিশার সঙ্গে সেই রাত থেকে?

মি. রহিম, প্লিজ কনট্যাক্ট মি - আর্জেন্ট"

ব্বাস্! গজলের রাতের মেহফিল ভেঙ্গে রহিম আছড়ে নড়লো শুনশান ছাদে, একা। বর্তমানের জমিনে।

।। ছত্রধর ।।

ছত্রধর উঠোনের এক কোণে ঠায় দাঁড়িয়েই ছিল। তার যদি রক্তমাংসের শরীর হত তাহলে সে এতক্ষণে ঠকঠক করেই কাঁপত। তার কাপড়ের তাপ্তির অনেক সেলাই খুলে গেছে। বাঁটের কাঠটাও নড়বড়ে হয়ে গেছে খানিক। ভেতরের ইস্পাতের কাঠির একটা ভেঙ্গে গেছে - আর ছেলেটার গায়ের নুন ছাল আর চামড়াও লেগে রয়েছে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে।

দাদা হলধর নিশব্দে কাঁদছেন - মাটিতে বসে। মনু খাটে শুয়ে রয়েছে গুম হয়ে।

ইমস্ - কেন তাকে বিধাতা মানুষ না করে শুধু ছাতাই বানিয়ে রেখে দিলেন। আর ছেড়ে দিলেন এই পরিবারে। আজ ওর দুটো হাত থাকলে মনুর গায়ে-মাথায় বুলিয়ে তো দিতে পারতো? ওকে এলোপাথাড়ী মেরে দাদারও কি কম কষ্ট হয়েছে। নাগাড়ে কেঁদে যাচ্ছে এক ঘন্টা!" আমি লক্ষ্মণরে কি কমু? আমি সরোজরে কি কমু? অদের রাজপুত্তুরের গায়ে হাইতপর্যন্ত তুললাম আমি! হা ঈশ্বর হায় আল্লা!"

মিনতির মুখ থেকে গোটা ব্যাপারটা শোনার পর হলধরের সারা শরীর কাঁপতে শুরু করেছিল। কি এত অধঃপতনে গেছে ছোঁড়াটা। মাত্তর পনেরো বছর বয়েসেই এমন বখে গেছে! প্রমাণ স্বরূপ রেসের মাঠের টাকে ঘোড়ার ছবিওলা বইটাই হাতে তুলে দিয়ে মুখঝামটা দিয়ে রাগ ঘরে চলে গেছে মিনতি। মনুর প্যান্টের পকেট থেকে বেরিয়েছে এটা, কাচতে যাবার সময়ই পাওয়া গেছে!

"চৌধুরীদা, ছাওয়ালডারে দেইখো যেন ভাইসা না যায়।" রক্তাক্ত লক্ষণ সরকারের এই ছিল শেষ কথা। হলধরের চোখের সামনে সেই বীভৎস দৃশ্য এখনো ভাসে। শান্তি দেয় না। শান্তি দেয় নি আজ পর্যন্ত। মনে পড়ে সরোজের সেই মিষ্টি মুখখান। মনু একেবারে মায়ের আদল পেয়েছে। অত সুন্দর ফুলের মতো মেয়েটাকে কি অত্যাচারই না করেছিল জানোয়ারগুলো। হলধরের মাথা দপ করে জ্বলে ওঠে। হায়নাগুলো খুবলে খুবলে খেয়েছিল, সরোজকে লক্ষণের চোখের সামনেই। দেশভাগের দোহাই দিয়ে, ধর্মের দোহাই দিয়ে।

লক্ষণের কিছু, করার ছিল না। ওকে আধমোড়া করে বেঁধে, পিটিয়ে ওর সামনেই উপর্যুপরি ধর্ষণ করা হচ্ছিল সরোজকে। গ্রামের অনেক হিন্দু মা বোনেদেরই - নৃশংসভাবে। এপারে মুসলমানদের ওপরও চলছিল এমনটাই। মানুষ হয়ে পড়েছিল ক্ষুধার্ত বাঘ বাঘ তাও হয়তো এতটা নৃশংস হয় না। সরোজদের লাশ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি নয় পুঁতে দেওয়া হয়েছিল, নয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল একত্র করে!

চৌধুরী পদবীর জেরে খানিকটা, কতকটা ভাগ্যের জোরে কি লাঞ্ছনা নিয়ে যে হলধর বর্ডার পেরিয়ে বেঁচে আসতে পেরেছে তা শুধু ওরাই জানে। মিনতির সিঁদুর নিজে হাতে মুছিয়েছে, শাখা, পলা নিজে হাতে ভেঙ্গেছে হলধর চৌধুরী। কোনখানে বোরখা পড়িয়ে, কোনখানে লা ইলাহি ইল্লালাহ' বলে ছিটকে আসতে পেরেছে কোনমতে। সব কিছু খুইয়ে। দুপ্রান্তের টপকে দেবার দালালদের তখন স্বর্গ। বাচ্চাগুলোর গলার ছোট্ট সোনার চেনগুলো ছাড়া সব লুটে নিয়েছে তারা।

শারীরিকভাবে ধর্ষিত না হলেও মিনতিকে ধর্ষিত, অপমানিত হতে হয়েছে মানসিকভাবে প্রতিমুহুর্তে যতক্ষণ না পর্যন্ত শেষমেশ আসতে পেরেছে শিয়ালদা স্টেশনের বিশাল উঠোনে। ধ্বস্ত, ক্লান্ত, অপদস্থ অবস্থায়। খিদে, ঘুম, অপমান, চোখের জল উবে গেছে শরীর-মন থেকে। মনু তখন দেড় বছর। বাবলু, রত্না - ছয় আর সাড়ে তিন। ওদের এখন আর কিচ্ছুটি মনে নেই।

মনু সারা রাস্তা মিনতির বুকের দুধ চুষতে চুষতে এসেছে। মাঝে মাঝে হলধর ভাবেন হয়তো কোলে কেঁদে উঠতে থাকা বাচ্চা দেখেই ধর্ষকারীরা হয়তো মিনতিকে ছেড়ে দিয়েছে। মনুই হয়তো বাঁচিয়ে দিয়েছে ওকে। তবুও সীমান্ত নানা রঙের চোখ শ্যেনদৃষ্টি দিতে কসুর করেনিকসুর করেনি মিনতির ভরাট দুটো বুকের দিকে তাকাতে সেই সময়হীন যাত্রাপথে। ধর্মের দোহাই আর মনুই হয়তো বাঁচিয়েছে তখন এক যুবতীর সম্ভ্রম! সেই থেকে আর ঈশ্বর-ফিশ্বর মানেন না হলধর। ধর্মের বইগুলো পুড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। ভেতরের ঘরের এককোণে ছোট্ট ঠাকুর - দেবতার কুলুঙ্গি থাকলেও একদিনও হলধর সেই দিকে যাননি।

আজ নিজের অজান্তেই কখন মুখ থেকে বেরিয়ে পড়ল "হা ঈশ্বর, হা আল্লা!" সজনেপোতা নামের ছোট্ট গ্রামটা যে এরকমই ছিল। স্বপ্ন দ্যাখেন হলধর মাঝে মাঝে। নিজেদের ভিটের, দুর্গামন্ডপের, যোগেন পন্ডিত আর আখতারচাচার। ঘুমের ঘোরে চাচার সাদা দাড়িতে দুষ্টুমি করে হাত বোলান হলধর ঠিক যেমনটি করতেন ছোট্টবেলায় দরগার উঠোনে বসে।

দুর্গামন্ত্রের সঙ্গে কখন মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল কলমাও। স্বপ্নের গ্রামটা, মিলনীয়া নদীটা, পুকুরপাড়, মেয়েদের দল বেঁধে খুনশুটি করার সেই জায়গাগুলো, আমের বাগান, কলাবাগান, বাঁশঝাড়, কত্ত পাখি আসতো ভিড় করে নদীর চরটাতে। শালিক, দোয়েল, টুনটুনি, বক আরোও কত নাম না জানা পাখির কিচিরমিচিরে ভরে থাকতো জায়গাটা। নিয়ামতমিঞার মুদীর দোকান ছিল একদম নদীর পাড়ে। দল বেঁধে - মিঞার দোকানের সামনে গেলেই বিনা পয়সায় মিলত কদমা, মিছরি, মুড়কি - এম্নি এম্নি।

দাঙ্গার আগুনে নিয়ামতের ছেলে খলিফা প্রায় কেটেই ফেলেছিল হলধরকে। ওকে দেখে চিনতে পারছিল না আর হলধর! এই ছেলেটাই ছোট্টবেলায় মিষ্টি সুরে বাঁশি বাজাতো। "কুত্তার বাচ্চা - পলা, শালা, পলা হেই দ্যাশ ছাইড়া!"

কেন পালাতে হলো হলধরদের। সাতচল্লিশে তো যায়নি তারা দেশ ছেড়ে। তবে আঠারো বছর পর আবার কেন? ছোট্ট একটা ঘটনা থেকে আশপাশের জায়গাগুলোতে লেগে গিয়েছিল দাঙ্গা। যার জের চলেছিল পরবর্তীতে লেগে যাওয়া সেই ঐতিহাসিক একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অবধি - আর তারপরেও। এ হিংসা কি আজও বন্ধ হল! - কেউ কি বন্ধ করতে পারলো?

মানুষের সঙ্গে মানুষের ভেদ তো ক্যানসারের মতো। একবার ছড়িয়ে পড়লে তার থেকে নিস্তার নেই। এপারে মুসলমানদের কাটা বলে ডাকা হয় আর ওপারে হিন্দুদের 'মালু'।

হলধর বড্ড ক্লান্ত হয়ে তাই নিভৃতে কাঁদছেন! মনুর বাদামী চোখ অ্যাসবেসটাসের দিকে। একটা পুরোনো টেবিল ফ্যানের হাওয়াতে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওর চুলগুলো! চোরের মার গায়ে লাগেনি ওর যতটা না লেগেছে জ্যেঠির মুখ থেকে বেরোনো দুদিন আগের কথাগুলো।

আঠার মতো আত্মায় সেঁটে গেছে কথাগুলো মনুর। ঠেস দেওয়া, খোনা দেওয়া, খোঁটা দেওয়া এসব গা-সওয়া হয়ে গেছে মনুর। এক জেঠু ছাড়া বাড়ির প্রত্যেকেই বুঝিয়ে দেয় ওকে - ও এই বাড়ির আশ্রিত, সে কথা - প্রায় প্রতি মুহুর্তেই। পরশুদিন হঠাৎই জেঠি বলে উঠেছিল, - গতরে না খেটেই তো দিব্যি খ্যাঁটনটা জুটে যাচ্ছে - বাপটাকে তো কেটেই ফেলল আর মাটাকে কত লোকে লুটেপুটে খেল - "মাথা ঝনঝন করে উঠেছিল মনুর। চাবুক মেরেছে কে ওকে ইলেকট্রিক শক দিয়েছে। কি বললো এটা জেঠি আজকে, তার মাকে লুটে-পুটে খেয়েছে! মানে চু..., ধর্ষণ করা হয়েছে তার মাকে!

ছত্রধরের প্রাণ নেই, চোখও নেই - তাই জলও নেই, তবে ঘরের কোণে শতচ্ছিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েও বুঝতে পারছিল দুজনেরই কারুর চোখেই আজ ঘুম আসবে না একজনের চোখে আগুন, অন্যজনের জল - সারারাত ধরে আসতেই থাকবে!

।। পারুল মন্ডল ।।

অনন্য সেনের বৈঠকখানাতে বসেছিল পারুল। প্লেন ড্রেসেই এসেছে এখানে। বেশীক্ষণ বসতে হয়নি ওকে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই চলে এসেছেন উনি।

"হ্যাঁ বলুন তো ঠিক কি ব্যাপারে এসেছেন?"

"মি. সেন আপনি তো 'বাংলার আয়না' - এই কাগজের সম্পাদক - তাই না!"

"সেটা ছাড়াও আমার অন্য পরিচয় আছে, আমি একজন রাইটার - বাইশটা বই পাবলিন্ড - আমার - আপনি পড়েন নি?"

"না স্যার, আমাদের চাকরিতে আর পড়াশুনো করার সুযোগ কোথায় - তবে শুনেছি, আপনার লেখা, 'রংধনুর মেলা' তো বেষ্ট অ্যাওয়ার্ড পেল না গত বছরে?

"ওয়েল - সে সব ছাড়ুন - বলুন কি খাবেন চা, কফি না সামথিং কোল্ড?"

না করলো না পারুল। তার তেষ্টা পেয়েছিল। কোকাকোলায় একটা বড় চুমুক দিয়ে সোজাসুজি প্রশ্নে চলে এল সে।

"স্যার, আপনি আমাদের সঙ্গে কো-অপারেট করবেন আশাকরি আপনি ঠিক কতটাকা স্যালারি পান কাগজটার সম্পাদনা করে?"

"কনট্রাক্ট অনুযায়ী বছরে ছত্রিশ লাখ আমার ফাইলে দেখে নিতে পারেন?"

"আর কন্ট্রাক্টের বাইরে?"

কাঁচাপাকা চুল ঠিক করে অনন্য একটা সিগারেট ধরালো। ভীষণ স্মার্ট চেহারা ভদ্রলোকের। লেখকদেরই মতো। নিপুণভাবে কামানো ফ্রেঞ্চকাঠ দাড়ি। রোলগোল্ডের চশমা। পারুল অপেক্ষা করছিল। সে জানে আজ থেকে অফিসিয়াল ইন্টারোগেশান চালু হল। লিষ্ট অনুযায়ী জায়গায় জায়গায় বিভিন্ন টিম গিয়ে বিভিন্ন মানুষজনের সঙ্গে দেখা করবে, কথা বলবে। এটা প্রিলিমিনারি জবানবন্দী। ভেতরে বিশেষ কেউ না এলেও, বাইরে লোক মোতায়েন করা আছে। এগুলো ওদের ট্রেনিং এর অঙ্গ! ধাপে ধাপে উঠতে হয়। কখনো নরম, কখনো গরম। কখনো ফরম্যাল, কখনো ইনফরম্যাল।

ওদের অফিসের চেম্বারে বসে এই সেনসাহেবই এত কায়দা করে না জিগ্যেস করেই সিগারেট ধরাতে পারতো না। কত হোমরা-চোমরার প্যান্ট হলুদ হয়ে যেতে দেখেছে পারুল। নিজেও কি কম! ওর অন্যরূপ দেখলে সেন কি করতো?

"সেটা কি বলার কথা?" ধোঁয়া ছেড়ে বললো সেন।

"ওয়েল সেটা আপনার ব্যাপার সেক্ষেত্রে আমরা অন্য ব্যবস্থা নেব স্যার!" আপনি রিফিউজ করতেই পারেন

"আপনি কি আমায় ধমকি দিচ্ছেন?" একটু বিরক্ত সেন।

"না - স্যার - ফিল্মে দ্যাখেননি পুলিশ বলে জাষ্ট বোঝাচ্ছি - জাষ্ট বোঝাচ্ছি" কাটা কাটা ভাবে বলল পারুল। এই একই কথা ফোনে রহিম শেখকেও বলেছিল পারুল দুদিন আগে। ফোনে। ফোন করেছিল, এসএমএস করেছিল - উত্তর দেয়নি। হঠাৎই পরশু নিজে থেকেই ফোন করেছিল রহিম।

রহিম, মহিম সরকারের খাস লোক। অফিসিয়ালি ওর বডি গার্ড। আনঅফিসিয়ালি ওর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। এ কেসে যা সমস্ত এভিডেন্স বা ইনফরমেশান লাগবে তার বেশ কয়েকটা দিতে পারে এই রহিম। গোয়েন্দা বিভাগের প্রথম লিষ্টে তাই প্রথম সারিতেই ওর নাম। সামনাসামনি দেখা না হলেও ফোনে গলা শুনে খানিকটা আন্দাজ করে নিতে হয় - এসবই ট্রেনিং এ শেখা। পারুলদের আলাদা করে সাইকোলজি ক্লাস করতে হয়েছে। একটু কথা বলেই বুঝে গেল পারুল লোকটা স্মার্ট তবে একটু বোকা স্মার্ট।

তিন চার বার মিটিং এ বসলেই অনেক কিছু বেরিয়ে পড়বে। ওকে একটু খেলিয়ে, সময় দেবে পারুল। এখন হপ্তাখানেক আর ফোনই করবে না।

এখন যেমন অনন্য যেন ওকে মাপছে। খুব সুশ্রী না হলেও পারুলের মধ্যে একটা বুদ্ধিদীপ্ত চটক রয়েছে। ওর চোখ, মুখ, ঈষৎ ভোঁতা নাক সব কিছু ছাপিয়েও একটা এমন কিছু আছে যেটা সহজেই কাউকে আকৃষ্ট করতে পারে। একটা চাপা ব্যক্তিত্বের দ্যুতি।

"বেশ, তাহলে আমি আজ উঠি" পারুল উঠে পড়লো। এ গভীর জলের মাছ, সহজে মচকাবে না। তারপর এ শহরের আঁতেল বর্গীয়দের মধ্যে পড়ে। এর অন্য দাওয়াই।

"আরে, উঠছেন কেন? বসুন" সিগারেটটা অ্যাসসেট্রতে গুঁজে অনন্য তাকালো ওর দিকে। "কেসটা কি বলুন তো? হঠাৎ এত জিজ্ঞাসাবাদ!"

হুঁ - ন্যাকা - যেন ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। ওদের কাছে ইনফরমেশান অনুযায়ী এই অনন্য সেন বিগত পাঁচ বছরে সরোজীনি ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট থেকে কয়েক কোটী টাকা সাবড়েছে। এছাড়া নিয়েছে অনেক সুযোগ সুবিধা। 'বাংলার আয়না'টা জাস্ট লোক দ্যাখানোর জন্য একটা মুখোশমাত্র।

"সেটা কি আমি আপনাকে বলার জন্য বাধ্য মিষ্টার সেন?"

পারুল দাঁড়িয়েই বলেছে।

ঝট করে ওর মনে পড়ে গেছে গত সপ্তাহে ওদের দপ্তরে সেই গোপন মিটিংটা। কমিশনার এ. এম. কে. খানকে সব কেসেই সিরিয়াল দেখে অভ্যস্থ ওরা কিন্তু এবারে যেন স্যার আরো গম্ভীর ছিলেন।

"ওয়েল জেন্টলমেন এ্যান্ড লেডিস। এটা কিন্তু শুধুই একটা কেস নয় - সল্ভ বা আনসল্ভ করাটাও এর উদ্দেশ্য নয় কারণ মনে রাখবেন আগামীদিনে একমাত্র এই কেসটাই সম্পূর্ণভাবে জনমানসে উঠে আসবে এবং ভবিষ্যতে শুধু বাংলার রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেই নয় বরং ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করবে এই সরোজীনি ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের ঘোটালা। যে কোন - তার একটা সুষ্ঠু সমাধান। এ কেসটা এমন কেসেরই একটাই মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে একটা জটিল আকার নেবে, এমন সময় এমন একেকটা মোচড় নেবে যে আমি সহ আপনারাও খেই হারিয়ে ফেলবেন। মনে রাখবেন প্রচন্ড চাপের মধ্যে কাজ করতে হবে আমাদের। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে অলরেডি হেডকোয়ার্টারে খবর এসে গেছে - এবং এক দুদিনের মধ্যে স্বয়ং সি.এম. সাহেবের সঙ্গে আমাদের কিছু উচ্চপদস্থ অফিসারদের বসতেই হচ্ছে।" এতটা বলে থেমেছিলেন খানসাহেব।

ঘরে উপস্থিত তেরোজনের মুখে একটাও কথা ছিল না।

"এই কেস সল্ভ করতে করতে আমরা যে কেউ যখন তখন সাসপেন্ড হতে পারি। চাকরি খোয়াতে পারি অথবা জীবনও!"

চমকে উঠেছিল পারুল। গোয়েন্দা বিভাগের যে কোন কেসেই জীবনের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু একটা অর্থনৈতিক কারচুপির কেসে জীবন মরণ সমস্য!

"আপাতদৃষ্টিতে একটা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের কারচুপির ঘটনা এরকম কেস আকছারই হচ্ছে - কিন্তু একে ঘিরে হয়েছে একটা বিশাল কন্সপিরেসি - একটা বিরাট গেম - আমাদের সত্তর বছরের বেশী স্বাধীনতায় এমন কেস, অনেক হয়েছে কিন্তু ব্রোকারি বা কাটমানির আড়ালে এত বড় আর্থ-সামাজিক দুনীর্তি যাতে সমাজের তাবড় তাবড় হোমরা-চোমরারা জড়িয়ে আছে - এতটা বোধহয় এই প্রথম!"

পারুলের কাছে এবার ব্যাপারগুলো পরিস্কার হচ্ছিল।

"নেতা, অভিনেতা, আমলা, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি, লেখক, সমালোচক কে নেই এই তালিকায়? আমরাও আছি!"

"ফলে এ কেসে কখন কার উইকেট ডাউন হয় তা এখনই বলা মুস্কিল আপনাদের নির্দিষ্ট কাজ দেওয়া হয়েছে - আপনাদের একটাই রিকোয়েষ্ট কাজের বাইরে গিয়েও একটা দায়িত্ব আর সততা আমি আশা করবো - হয়তো আমি নিজেও সরে যেতে পারি বা আমাকেও সরানো হতে পারে তবুও আপনারা প্রত্যেকেই আমার খুব কাছের - নিজের হাতে তৈরী করা বলা যায় - অতীতে আমরা এমন অনেক অপারেশন সফলভাবে করেছি - যেগুলো কোনদিনই জনমানসে আসেনি, আসবেও না - বয়স্ অ্যান্ড গার্লস আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ!"

একটু আবেগাচ্ছন্ন লাগছিল সায়েবকে। বোঝা যাচ্ছিল কি প্রচন্ড চাপে আছেন তিনি।

"ওকে লেট আস প্রসিড, অল দ্য ভেরি বেষ্টট্যু ইউ অল!"

সবাই থমথমে মুখেই বেড়িয়ে আসছিল ঘর থেকে তখনোই খানসাহেব থামালেন ওদেরকে "আর একটা কথা - খুব ইম্পর্ট্যান্ট - এমন সময় আমিও হয়তো এমন সব ডিরেকশান দিতে পারি তোমাদের - আইমিন আপনাদের যাতে করে আমার অবস্থান নিয়েও আপনাদের সন্দেহ হতে পারে - বাট অনলি লিসিন ট্যু হোয়াট ইত্তর কনশায় টেল্স ইউ!" সেনের তীক্ষ্ণ চাহনির সামনে দাঁড়িয়ে সেদিনের সেই মিটিংটাই মনে পড়ে গেল পারুলের।

"জানতে পারবেন - খুব শিগগিরি মি. সেন - মিট ইউ সুন সার, গুড ডে!" বলেই আর দাঁড়ালো না পারুল। বুঝতে পারছিল একজোড়া শ্যেনদৃষ্টি পেছন থেকেই জরিপ করছিল ওকে। কামুক দৃষ্টিতে।

(ক্রমশ)

প্রচ্ছদঃ নীল মজুমদার