গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

অন্তরীক্ষের অদ্বিতীয় সম্বোধন (দ্বিতীয় পর্ব) [ধারাবাহিক]



হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়


(৪)

পরের দিন। একেবারে কাকভোরে উপেনের ঘরের সদর দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। এত ভোরে আবার কে এলো। উপেন দাঁত মাজতে মাজতেই দরজাটা খুলে দেখে, একটা অপরিচিত ছেলে দাঁড়িয়ে।

- কী হ'ল।

- কিছু না কাকু। আমি একটা জরুরী ব্যাপারে তোমার কাছে এসেছি।

- তা এই ভোরবেলায়। আর সময় পেলে না।

- না কাকু। ভাবলাম, তুমি যদি কোথাও বেরিয়ে যাও। তাই সকাল-সকাল এলাম।

- তাহলে কি পরে আসবো?

- এসেই যখন গেছো তখন আর পরে কেন, বল কী দরকার?

- বলছিলাম কী কাকু, এই বাড়িটা তো সরকার বানিয়ে দিয়েছে, তাই জানতে এসেছিলাম কীভাবে এটা হলো। আমাদের পাড়ায় একটা খুব গরিব লোক আছে। ভিক্ষা করে। ওর যদি এইরকম একটা ঘর সরকার বানিয়ে দিতো তবে লোকটার খুব উপকার হতো। তাই নিয়মটা জানতেই এখানে ছুটে এলাম।

আমি তো খুড়া ওসব জানি না। যা করার আমার ছেলেই করেছে। ঘরে এসো। আমি ছেলেকে ডেকে দিচ্ছি। এই বলে সে তার ছেলেকে ডাকলো, "এই রূপেন। দেখ না, একটা ছেলে কী জানতে চাইছে।"

রূপেন চা খেতে খেতে বেরিয়ে এলো। ছেলেটাকে দেখেই তার মনে হলো, কোথায় যেন দেখেছে। বললো, "তোমাকে খুব চেনা চেনা লাগছে। কোথায় থাকো তুমি?"

- ওই তো সামনের বস্তিতে।

রূপেন ওকে ঘরের ভেতরে ডেকে বসালো। আর সঙ্গে সঙ্গে ঘরের থেকে বেরিয়ে আদরিনী সোজা বাথরুমে। ভয়ে তার পা যেন আর এগোয় না। কে জানে, কী সর্বনাশ অপেক্ষা করছে এই সাত সকালে! আদরিনীর বুক ধুকপুক করতে থাকে। আর তক্ষুনি রূপেন ডাকে, "আদু! এক কাপ চা নিয়ে আয় তো।"

"না-না থাক্" বলতে গিয়েও থেমে গেলো লখাই। এ তো মেঘ না চাইতেই জল। এরকমটা তো সে আশায় করেনি। একটা আলোর ফোয়ারায় সে যেন হাবুডুবু খেতে শুরু করলো।

ততক্ষণে রূপেন শুরু করে দিয়েছে তাদের সরকারি ঘর পাওয়ার সাতকাহন। লখাই মনোযোগ সহকারে তার সেই বৃত্তান্ত শোনার ভান করে আদুর প্রতীক্ষায় বসে থাকলো।

আদরিনী কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। চায়ের কাপটা কি মায়ের হাতে দিয়ে পাঠিয়ে দেবে। নাকি নিজেই নিয়ে যাবে। ওর অন্তরে তখন চলছে জোয়ার-ভাটার ওঠানামা। গিয়ে ফ্যাসাদে পড়বে না তো? এ কার পাল্লায় পড়লাম রে বাপ্। ছেলেটা তো মোটেই সুবিধের নয়। আজ আর আমার রক্ষে নেই। আদরিনী বড্ড বেকায়দায় পড়ে গেলো। আজ কার যে মুখ দেখে উঠেছিল সেটাই ভাবছে আদরিনী।

এদিকে মা চা তৈরি করে কাপে ঢেলে আদরিনীকে ডাকলো। আদরিণী তার মাকেই চায়ের কাপটা নিয়ে যেতে বললো।

মা রেগে বললো, "ও কি বাঘ না, ভালুক। তোকে কামড়াবে নাকি!"

এ যে কামড়ের চেয়েও ভয়ঙ্কর - তা আর কে বুঝবে। আদরিনী দোটানায় পড়ে যায়। শেষমেশ সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে চায়ের কাপ নিয়ে নিঃশব্দ পায়ে এগিয়ে যায় আদরিনী।

দরজার মুখোমুখি একটা তক্তাপোষে বসে দাদা রূপেন। তার বাঁ পাশে একটা কাঠের চেয়ারে লখাই। কায়দা করে সেটা দেখে নিয়েছে আদরিনী। মহা মুশকিল! লজ্জার মাথা খেয়ে আজ লখাইয়ের চোখে চোখ ফেলতেই হবে তাকে। ইশারায় কিছু একটা না জানিয়ে আর পারা যাবে না। যে করেই হোক, লখাইকে ওদের পরিচয়ের কথা গোপন রাখতে সে ইশারায় বুঝিয়ে দেবেই। নইলে একেবারে লঙ্কাকান্ড ঘটে যাবে যে!

আদরিনী দরজার ডানদিক দিয়ে লখাইয়ের দিকে তাকায়, যেন দাদা না টের পায়। ডানদিকে এগিয়ে আসতেই লখাই ওর চোখে চোখ ফেলে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে আদরিনী বারকয়েক ওকে চোখ টিপে বোঝাবার চেষ্টা করে যেন পুকুরের ঘটনা লখাই না বলে দেয়। রূপেন ওদের চোখাচোখি খেয়াল করে নি।

এবার ঘরে ঢুকেই আদরিনী লখাইয়ের হাতে চায়ের কাপটি যেই দিয়েছে, অমনি লখাই তার একটা আঙুল চটজলদি টিপেই ছেড়ে দিয়েছে। এটাও রূপেনের নজর ফসকে যায়।

আদরিণী চটপট ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা মায়ের কাছে।

ঘন্টাখানেকের মধ্যেই লখাই রূপেনদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। আর একটু বসার ইচ্ছে ছিল তার। আবারও আদরিনীকে দেখার ইচ্ছে হচ্ছিল। দেখার চেষ্টাও করছিল আপ্রাণ। কিন্তু আদরিনী আর ধরাছোঁয়ার কাছেই এলো না। শুধু দু'চারটে কথা তার কানে আসছিল। এবং কথা শুনে লখাইয়ের মনে হলো আদরিনীর গলার আওয়াজটা যেন একটু বেড়েছে। হয়তো একটু খুশি তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে এই মুহূর্তে। কিম্বা হয়তো লখাইকে তার কণ্ঠস্বর শোনানোর জনাই গলার স্বর একটু বাড়িয়েছে। তাই সে বেরিয়ে পড়ে।

দাদা বের হতেই আদরিনী দ্বিধাগ্রস্ত মনে ছেলেটির আসার উদ্দেশ্য জানতে চাইলে রূপেন ঘটনাটা যখন বললো, আদরিনীর বুক থেকে যেন একটা জগদ্দল পাথর সরে গেলো। এবং সে বুঝেই গেল যে লখাইয়ের ওখানে আসার আসল মতলবটা কী ছিল।

লখাই ওদের বাড়ি থেকে বের হল আদরিনীর আঙুলের স্পর্শের অনন্য অনুভূতিকে সাথে নিয়ে। সেই আঙুলের স্পর্শের কি আনন্দ তা এই মুহূর্তে উপলব্ধি করলো সে।

(৫)

এইসব পুরানো দিনের কথা মনে পড়ছে আদরিনীর। ঠোঁট দুটো মাঝেমধ্যেই তার কেঁপে কেঁপে উঠছিল।

তখন তো আদরিনীকে একদিন না দেখতে পেলেই লখাই মনমরা হয়ে থাকতো। আদরিনী ভাবে, 'আমাদের পাড়ায় রোজ রোজ তার আসা যাওয়া বেড়ে যাওয়াতে কয়েকবার কিছু মস্তানের শাসানিও তাকে খেতে হয়েছিল। তবু হাল ছাড়েনি। একদিন তো পুকুর থেকে ফিরবার সময় জোর করে সে আদরিনীর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিয়েছিল। কি যে সাংঘাতিক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছিল আদরিনীকে তা বলে বোঝাতে পারবে না। আর আজ! আজ কিনা সন্দেহ করছে! সে ভাবে, "আমি অন্য ছেলের সঙ্গে প্রেম করছি! একথা ভাবতে পারলো? একটা পেপসির জন্য এতবড় কলঙ্ক দিল আমাকে। এই মিথ্যা কলঙ্ক মেখে বেঁচে থেকে কী লাভ!"

আদরিনী আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে কিনা ভাবতে লাগলো। আবার ভাবলো, সত্যি সত্যিই সে বাপের বাড়ি চলে যাবে কিনা চিরদিনের জন্য। মেঝেতে বসে পড়লো আদরিনী। চোখের কোনায় তখন জল ছলছল করছে তার। চোখে ভেসে ওঠে সেই সিঁদুর পরা প্রথম দিনটির কথা।

আদরিণীর মনে পড়ে সেই পর্বের কথা যখন ক্রমে ক্রমে জমে উঠেছে দুজনের প্রেম। তখন আর পুকুর যাওয়া আসার পথটুকুই নয়, সন্ধে হলেই বিভিন্ন পাড়ার অলিতে-গলিতে তাদের দেখা যায়। কখনো কোনো এক খেলার মাঠের মাঝামাঝি বা তার আশেপাশে বসে কথার পর কথা শেষ হতেই চায় না। আবার কখনো কোনো এক ব্রিজের ফুটপাতে। কোনো কোনো দিন কোনো কারণবশত কেউ গরহাজির হলে এরপর কোথায় দেখা করবে তা ঠিক করা খুবই অসুবিধা হতো। তখন সেই পুরানো পদ্ধতি - পুকুরঘাট, পেয়ারাতলা।

(৬)

কেন পেয়ারাতলা! আসলে কৃষ্ণের কদম গাছের মতোই লখাইয়ের প্রেম নিবেদনের বৃক্ষ এই পেয়ারা গাছ!

সেই পেয়ারাতলাতেই একদিন লখাই আদরিনীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে ফেলে। আদরিনী কিন্তু দাদার বিয়ের আগে বিয়ে করতে সম্মত না হওয়ায় অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকলো না লখাইয়ের। অতএব ততদিন মাঠ ময়দান আর গলিঘুঁজিই থাকলো তাদের মিলনের কেন্দ্র।

ক্রমে প্রেমের উন্মাদনা পেয়ে বসলো তাদের। কেবল সন্ধে নয়, এবার ভোরবেলাতেও শুরু হলো তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ। এ তো গ্রাম নয়, শহর এলাকা। তাই অতটা কড়াকড়ি নেই এখানে। তাছাড়া বিভিন্ন অছিলায় এখানে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়া যায়। বাজার করা, প্রাতঃভ্রমণে যাওয়া - এইরকম অনেক কিছুরই বাহানা চলে শহরে, যা গ্রামে সচরাচর দেখা যায় না। শহরে দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকলেও জবাবদিহির দরকার হয় না। গ্রামে হলে তো "গেল গেল" রব পড়ে যেতো।

যাই হোক, এভাবে ফাঁক পেলেই অন্তত দেখাদেখির কাজটা সেরে নিতো দুজনেই। এবং সেই দেখার যে কী অনুভূতি, তা এতদিন তাদের বোধের মধ্যেই ছিল না। প্রেমে যে এতো সোহাগ মাখা থাকে, ভুক্তভোগী ছাড়া আর কে-ই বা তা বুঝবে।

এইভাবে পেরিয়ে যাচ্ছিল দিনের পর দিন থেকে মাস। দু'এক জনের নজরে যে পড়েনি এ দৃশ্য তা বলা যাবে না। কথাটা উপেনের কানেও পৌঁছেছিল। উপেন প্রথমটায় বিশ্বাস করে নি। কিম্বা বয়সের কথা ভেবে ওসব অভিযোগকে সে আমল দেয় নি। আমল দিতেও চায় না।

কথাটা সৌদামিনীর কানেও দিয়েছিল কেউ। সৌদামিনী স্বামীকে সে কথা জানতে দেয় নি। শুধু লখাইকে বলেছিল, "কী সব শুনছি ঠাকুরপো? ডুবে ডুবে জল খাচ্ছো নাকি!"

- কী যে বলো বৌদি! তুমিও বিশ্বাস করে নিলে। আমাকে ঐ রকম মনে হয়, বলো?

- না না,বলা যায় না তো। উঠতি বয়স। এখন লঘু-গুরু, ভূত-ভবিষ্যত নিয়ে তো মাথা ঘামানোর সময় নয়। তাই ভাবছিলাম হলে হতেও পারে।

- দাদাকে বোলো না কিন্তু!

- কথাটা সত্যিই তাহলে, বলো?

মুচকি হেসে বেরিয়ে যায় লখাই।

তাদের এই দুজনের বাড়িতেই যে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করেছে তা তারা পরস্পর আলোচনা করতো প্রায়ই। কীভাবে লক্ষ্যভেদ করা যাবে তা নিয়ে নানা পরিকল্পনা তাদের মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করলো।

তৃতীয় কোনো বন্ধু বা বান্ধবীকে জানালে কি ভালো হবে? যদি কোনো পরামর্শ দিতে পারে! নাকি কাউকে না জানিয়েই পালিয়ে যাবে? কিন্তু যাবেটা কোথায়! ফিরে তো আসতেই হবে। কোথায় আসবে? লখাই তো আর চাকরি করে না। আলাদা ঘরও নেই। দাদা বৌদির সঙ্গেই থাকে। ফিরে তো সেখানেই আসতে হবে। তখন দাদা যদি মেনে না নেয়!

আদরিনীর ঘরে গিয়ে উঠবে? ওরাই বা মেনে নেবে কেন?

এইসব জল্পনা কল্পনার মধ্যেই চলছিল তাদের খুনসুটি।

সেইসব পুরনো দিনের কথা আদরিনীর মতো হুবহু মনে না পড়লেও ঘটনাগুলো ইতস্তত লখাইয়েরও মনে পড়ছিল!

ওভাবে বলা ঠিক হয়নি তার। লখাই একটু শান্ত হয়ে ভাবতে থাকে। পেপসি কোথায় পেলো সেকথা ভালভাবে সে জিজ্ঞেস করলেই তো পারতো।

লখাই ভাবে, "আদরিনীরও দোষ আছে। সে তো সহজ ভাবেই জানিয়ে দিতে পারতো কোথায় পেয়েছিল পেপসির বোতল। তা না সেও বাঁকা জবাব দিয়ে বসলো।" তবু তার মনে হতে থাকে, "না, আদরিনীকে সন্দেহ করা তার ঠিক হয়নি। আদরিনী সেরকম মেয়ে নয়। অ্যাতো বছর সে তার সাথে ঘর করছে। কোনোদিন তো এরকম ভাবনা মনের মধ্যে আসে নি। তবে আজ কেন তার এমন দুর্মতি হলো!

বিয়ের আগে তার যে সংগ্রাম, যে ভালোবাসা তা কি নেহাৎ অভিনয় ছিল। তা তো নয়।"

লখাইয়ের মনে পড়ে তাদের প্রেম এক বছর হতে না হতেই একদিন আদরিনী জানায়, "জানো, আজ তোমাকে একটা ভালো খবর দেবো।"

- কী!

- আমার দাদার বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে।

- তাই নাকি।

- হ্যাঁগো, তাই।

লখাই খুব উৎফুল্ল হয়ে জানতে চাইলো, 'কবে?'

খুব জানতে ইচ্ছে করছে তাই তো? খুব আনন্দ - তাই না? বলেই আদরিণী শুরু করলো বিয়ের সাতকাহন।

এখনো দিন ঠিক হয়নি। দেখাশোনা, দেনা- পাওনা সব চুকে গেছে। এবার পাঁজিতে একটা ভালো দিন দেখে ওরা জানাবে। তারপর দু'পক্ষের কোনো আপত্তি না থাকলে আর কী! এবার বিয়ের যোগাড়যন্ত্র। একথা বলেই আদরিনী খুশিতে গদগদ হয়ে বললো, "জানো, বৌদির নামটাও বেশ মিলে গেছে দাদার সঙ্গে।"

- কেমন?

- দাদা রূপেন আর বৌদির নাম রূপসী। কি, মিল হয়নি?

- খুব সুন্দর মিলে গেছে। তো দেনা পাওনার কী হ'ল?

দুজনের এখন আর প্রেমের কথা তেমন হয় না। আদরিনী দাদার বিয়ের গল্পেই মশগুল থাকে। বলে, "মেয়েটি দেখতে কী সুন্দর। টানা টানা চোখ। পিঠভর্তি চুল। ঠোঁটের কাছে ছোট্ট একটা তিল।" তারপরেই বলে, "আমি তো আর দেখতে যাইনি। ওরা একটা ফটো দিয়েছে। সেই ফটো দেখেই বলছি।"

(ক্রমশ)