গল্প/অণুগল্প/উপন্যাস

কটু গন্ধ (দ্বিতীয় পর্ব)



অচিন্ত্য সাহা


কাদামাটির মধ্যে কী যেন একটা মাঝে মাঝেই নড়েচড়ে উঠছে। দূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ভোর হতে এখনো ঢের দেরী। নদীর পাড়ে বাড়ি হওয়ায় তিমিরের সাথে নদীর সখ্যতা অন্যদের থেকে একটু বেশি। নদীর বুকে ভেসে ওঠা পৃথিবীটা প্রতিদিন নতুন করে ওর চোখে ধরা পড়ে। ভোর সাড়ে তিনটের সময় বিছানা ছেড়ে ঝুল বারান্দায় চলে আসে। সূর্য ওঠার আগেই নদীর সাথে কথা বলে। নদীর বুকে জমে ওঠা গভীর বেদনা ওর বুকে ব্যথার পাহাড় সৃষ্টি করে। ব্রাহ্মমুহূর্তে যখন চারিদিক নীরব নিথর নিস্পন্দ তখন নদীর কথা মন দিয়ে শোনে। শুনতে শুনতে কোন অচিন দেশে সে হারিয়ে যায়। বারান্দায় পেতে রাখা চেয়ার আর ঝুলন্ত দোলনায় অস্থির মনটা কেবলই প্রশ্ন করে - নদীর মনোকষ্ট কি কেউ কোনোদিন বুঝবে না?

কখনো কখনো অঝোর ধারায় কাঁদে। গতকাল সারাদিন ধরে আকাশে জমে থাকা মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়েছে। আনন্দে ওর চোখেও বৃষ্টির ধারা নেমেছিল। ফলে কিছুটা হলেও নদীতে প্রাণের স্পন্দন দেখা যাচ্ছে। নদীর পাড়ে কাঁদায় ডুবে আছে কী একটা! ঝুল বারান্দা থেকে স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু ওর নড়াচড়া বেশ বোঝা যাচ্ছে। আকাশ এখন বেশ পরিষ্কার। রাতের শেষ প্রহরে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদকে একটু বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। চন্দ্রালোকিত জ্যোৎস্নায় দোতলার বারান্দা থেকে নদীর পাড়টাকে বেশ ভালো করে দেখে। দুই একজন জেলে মাঝির অস্পষ্ট কথাবার্তায় বুঝতে পারে আজ ওদের জালে প্রচুর মাছ ধরা পড়েছে। একটু পরে নগেন ঠাকুর হরিনাম জপতে জপতে নদীতে এসে নামবেন। গুনে গুনে তেত্রিশটি ডুব দিয়ে সূর্য প্রণাম সেরে বিড়বিড় করে কীসব মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে গিয়ে পুজোয় বসবেন। এটা ওঁর নিত্যকার অভ্যাস। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বন্যা মহামারী যা-ই ঘটুক না কেন ওঁর নিত্যকার কাজকর্মে তার কোনো প্রভাব পড়বে না। করোনা কালে যখন সারা পৃথিবী ঘরবন্দী তখনও নগেন ঠাকুর জলাঙ্গীর বুকে নিয়মিত সাঁতার কেটেছেন। ঠাকুরমশাই ঘাটে নামার আগেই নদীর পাড়ে যেতে হবে। পরখ করে দেখতে হবে ওখানে কী নড়াচড়া করছে।

বেশ কিছুটা সময় বারান্দার রেলিঙে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করে তিমির - না, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এবার নদীর পাড়ে যাওয়া দরকার। ওখানে গিয়েই দেখতে হবে ওই সজীব বস্তুটা আসলে কী!

নদীতে স্নান করার জন্য যে বারমুডাটা ব্যবহার করে সেটাই পরে নেয় তিমির, একটা টি-শার্ট পরে কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসে। তখনও নিমনিমে অন্ধকার। আবছা আলোয় চোখটা এখন অনেকটা সয়ে গেছে। নদীটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। স্নান ঘাটের বামদিকে লক্ষ্য করে দেখা গেল কাঁদার মধ্যে অনেক কষ্টে মুখটা উপরে তুলে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে জলজ্যান্ত একটা মানুষ। তিমির গুটিগুটি পায়ে ওর কাছে পৌঁছে জিজ্ঞেস করে - এই যে আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? আপনি কে? কোথা থেকে আসছেন একটু বলবেন?

তিমিরের কথার জবাব দিতে গিয়ে কেবল ঠোঁট দুটো কাঁপিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলো কিন্তু বলতে পারলো না। কেবল একটা অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। মাঝে মাঝে শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। ভালোভাবে লক্ষ্য করে তিমির দেখতে পেল কলকাদার মাঝখান থেকে উঠে আসার ক্ষমতা লোকটার নেই। হাত বাড়িয়ে ওকে তোলা যাবে বলে মনে হয় না। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। এখনই নগেন ঠাকুর এসে পড়বেন। ঠাকুর মশাইয়ের আবার নানান ওজুহাত, ওজর আপত্তি আছে - সহজে কাউকে ছুঁয়ে দেখবেন না, কোন অজাতকুজাত বলে বিড়বিড় করবেন, তদুপরি একশো আটবার রামনাম জপ করবেন এবং তেত্রিশটা ডুব দিয়ে স্তোত্রপাঠ করে শরীরকে শুদ্ধ পবিত্র করে শাপশাপান্ত করতে করতে মন্দিরে গিয়ে ধ্যান আরাধনায় মগ্ন হবেন। সুতরাং ওঁর কাছে কোনোরকম সাহায্য পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

এখন এতকিছু ভাবার সময় নেই। তিমির গামছায় জল ভরে নিয়ে অনাহূত আগন্তুকের গায়ে ঢালতে শুরু করে। ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে লোকটি একটু নড়েচড়ে ওঠে। তখন তিমির ওকে টেনে তুলে বসিয়ে দেয়। তিমিরের সহযোগিতায় সে কোনোরকমে উঠে বসে। ওর গায়ে থাকা শতচ্ছিন্ন কর্দমাক্ত সার্টটা তিমির একটানে খুলে ফেলে। জবজবে সার্টটা খুলতেই ওর আলগা শরীরে আঘাতের চিহ্নগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। জলকাদায় অনেকটা সময় পড়ে থাকার জন্য শরীরটা একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তিমির অতিকষ্টে লোকটাকে টানতে টানতে নদীর পাড়ে একটা পরিষ্কার জায়গা দেখে বসিয়ে দেয়। তখনই নগেন ঠাকুর গুটি গুটি পায়ে হরিনাম জপ করতে করতে এসে হাজির হন। তিমির এবং ওর পাশে থাকা জলকাদা মাখা অচেনা লোকটাকে দেখে কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করেন - হ্যাঁ গো খোকা লোকটি কে গা? এই কাকভোরে ও এলোই বা কোত্থেকে?

- আমি ঠিক জানি না ঠাকুরমশাই। ভোরবেলা আমার বাড়ির ঝুল বারান্দা থেকে ওকে দেখতে পেলাম। এইমাত্র নেমে এসে জল থেকে তুললাম। আগে একটু পরিচর্যা করি তারপর নাহয় ওর পরিচয় জানা যাবে।

- তা বেশ বাবা, বেশ। তুমি তোমার ধর্ম পালন করো, আমি আমার কাজ সেরে মন্দিরে যাই।

- না না ঠাকুরমশাই। আজ আর ওকথা বললে শুনছি না। বরং আমাকে একটু সাহায্য করো।

- কী সাহায্য করবো বলো।

- বেশি কিছু না, তোমার ওই ঘটিটা একটু দাও। এর গায়ে লেগে থাকা জলকাদা ধুয়ে দেবো।

- না বাপু, সেটি হচ্ছে না। এটা আমার অতি পবিত্র ঘটি। কেবলমাত্র ঠাকুরকে স্নান করানোর জন্য, অন্য কোনো কাজে এটি ব্যবহার করা যাবে না।

- ধরে নাও আজ এটাই তোমার ঠাকুর।

- বাজে কথা রাখো। ঠাকুর কি যেখানে সেখানে পড়ে থাকে, আমাকে কি হাঁদা গঙ্গারাম পেয়েছ? সরে যাও, সরে যাও, আমাকে আমার কাজ করতে দাও, দেরী হয়ে যাবে।

- ভালো করে ভেবে দেখো ঠাকুরমশাই। মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা কিন্তু এটাই চান।

- যত যা-ই বলো না কেন আমি আমার ঘটি তোমাকে দিতে পারবো না।

গুনে গুনে তেত্রিশটি ডুব দিয়ে জলজ্যান্ত একটা অসহায় মানুষটাকে উপেক্ষা করে ঠাকুরমশাই চলে গেলেন! এটা কি ওঁর পক্ষে ভালো কাজ হলো? দেবতা কি এতে সন্তুষ্ট হবেন ? হে জগদীশ্বর! তুমি কি দেখতে পাচ্ছো, এটাই কী তোমার বিচার? তুমি এসব দেখেও বধির হয়েই থাকবে? এটাই যদি তোমার মনের ইচ্ছে হয় তাহলে মানুষ কীসের জন্য তোমাকে স্মরণ করবে?

তিমিরের আর্তি শুনে নদীর বুকে ঢেউ উঠে, বাতাস উন্মত্ত আক্রোশে ফুঁসে ওঠে।

- কী হয়েছে তিমির? অমন করে একা একা কীসব বলছো বেটা?

পিছন থেকে বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে একটি ছায়ামূর্তি কথাগুলো বলে উঠলেন। তিমির অবাক হয়ে পিছন ফিরে তাকিয়ে কিছু না দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বললো - কে? কে বলছেন?

- আমি।

- কে আপনি? আপনাকে তো দেখতেই পাচ্ছি না।

- আমাকে তুমি দেখতে পাবে না, বেটা। আমি যা বলছি সেটা মন দিয়ে শোনো। যে ছেলেটিকে তুমি জলকাদা থেকে টেনে তুলেছো তাকে বাড়ি নিয়ে যাও। একটু যত্ন-আত্তি করো। ছেলেটি বড়ো অভাগা।

- কিন্তু আপনি! মানে একে চিনলেন কীভাবে?

- আমাকে তুমি চিনবে না। কেউ আমাকে চেনে না। সব মানুষের মনের ভেতরে আমার বাস। আমার নাম চেতনা। প্রদীপের সলতের মতো ক্ষীণ শিখা হয়ে আমি মানুষের মনের গভীরে জ্বলতে থাকি। সময় সুযোগ পেলে সেটাকে একটু উসকে দিয়ে আমি চলে যাই। ভয় পেওনা আমি কারো ক্ষতি করিনা।

তিমির কিছু বলার চেষ্টা করলো কিন্তু তার আগেই ছায়ামূর্তিটি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। ওর কাছে ঘটনাটা অপ্রত্যাশিত এবং স্বপ্নের মতো মনে হলো। নদীর দিকে চোখ রেখে নদীকে জিজ্ঞেস করলো - নদী তুমিই বলে দাও এখন আমার কী করণীয়।

জলকাদায় মিশে থাকা লোকটা 'জল জল' বলে কাতরাতে লাগলো। তিমির আঁজলা ভরে পরিষ্কার নদীর জল নিয়ে এলো। ওর মুখে কিছুটা দিয়ে বাকি জলটা দিয়ে ওর মুখ ধুয়ে দিলো। বিন্দু বিন্দু জল ওর ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে মুখে প্রবেশ করতেই কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলো। আরও খানিকটা জল এনে তিমির ওর চোখে মুখে দিলো। শীতল জলের ঝাপটা ওকে বেশ চনমনে করে তুললো। ধীরে ধীরে উঠে বসলো। তিমিরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে - আমি এখন কোথায়? এখানে কীভাবে এলাম?

তিমির খানিকটা আশ্বস্ত হলো। ওকে জিজ্ঞেস করলো - তুমি কে, কোথা থেকে আসছো?

- আমি কিছু জানিনা। আমার বড্ড খিদে পেয়েছে। একটু খাবার দিতে পারো?

- হ্যাঁ, নিশ্চয়। আমার বাড়ি গেলেই খাবার মিলবে। কাছেই আমার বাড়ি। একা একা যেতে পারবে তো?

- পারবো, আমাকে পারতেই হবে। আপাতত আমার হাতটা ধরো, উঠে দাঁড়াই।

তিমির হাত বাড়িয়ে ওকে তুলে দাঁড় করিয়ে দেয়। বাড়ি পৌঁছে সে লোকটাকে ওয়াশরুম দেখিয়ে স্নান করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য সমস্ত ব্যবস্থা করে দেয়।

খাওয়া দাওয়া সেরে বেশ তরতাজা হয়ে তিমিরকে তার জীবনে ঘটে যাওয়া বিগত কয়েক দিনের ঘটনার আনুপূর্বিক বিবরণ দেয় - সাংবাদিকতার জীবন ছেড়ে মোমবাতির কারখানায় কাজ, শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা, দাবি দাওয়া, আন্দোলন, মালিক পক্ষের নিষ্ঠুরতা, মকবুল ভাই - একে একে সব ঘটনা তিমির কে জানায়। কীভাবে ওকে এবং মকবুল ভাইকে অপহরণ করা হয় সেটুকু ছাড়া আর কিছু ওর মনে নেই। মকবুল ভাই এখন কোথায় কী অবস্থায় আছে তা সে জানে না।

সৌমিক বলতে থাকে - বড়ো ভালো মানুষ ছিলো মকবুল ভাই। নামাজ, রোজা, ঈশ্বর চিন্তা থেকেও তার কাছে বড়ো ছিলো মানবিক মূল্যবোধ। শ্রমিক আন্দোলনে আমার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। ওর বাড়ি তেহট্টের কাছাকাছি কোনো এক গ্রামে। বাড়িতে ওর স্ত্রী পুত্র কন্যা এবং মা আছেন। আমাকে অনেক বার ওর বাড়ি যাবার জন্য অনুরোধ করেছে। আমি বলতাম মকবুল ভাই, এখানকার সমস্যা মিটে গেলেই তোমার বাড়ি যাবো। ভাবির হাতের রান্না খেয়ে আসবো। কিন্তু কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল!

তিমির জিজ্ঞেস করে - ওর বাড়ি কোন গ্রামে সেটা কি তোমার মনে আছে?

- বলেছিল তেহট্ট বাসস্ট্যান্ডে নেমে কিছুটা গেলেই জলাঙ্গী নদী। নদী পেরোলেই ওদের গ্রাম। ওখানে গিয়ে মকবুলের নাম বললেই যে কেউ ওর বাড়ি দেখিয়ে দেবে। আমি এখন কোথায় আছি একটু বলবে?

- হ্যাঁ, তুমি এখন কৃষ্ণনগরে আছো। কাছেই বাসস্ট্যান্ড। এখান থেকে সরাসরি তেহট্টঘাট যেতে পারবে। কিন্তু একটা প্রশ্ন আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে - তুমি এখানে কীভাবে এলে?

- আমি নিজেই কিছু জানিনা। সম্ভবত যারা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল তারাই আমাকে মৃত মনে করে নদীতে ফেলে দিয়েছে। নদী - মা'র স্পর্শে আমি বেঁচে ফিরেছি আর তোমার মতো একজন ভালো মানুষের হাতে এসে পড়েছি।

তিমিরের আশৈশব নদীপ্রেম যে কতটা আন্তরিক তা আর একবার সে অনুভব করলো। একজন মানুষ কে বাঁচিয়ে তুলতে পেরেছে এটা তার কাছে কম পাওয়া নয়। সৌমিককে উদ্দেশ্য করে বললো - তুমি বরং ক'দিন এখানে থাকো, বিশ্রাম নাও তারপর মকবুল ভাইয়ের সন্ধানে বেরিও। তোমার শরীর ঠিক নেই, এখন বিশ্রামের প্রয়োজন।

- কিন্তু আমি যে শান্তি পাচ্ছি না ভাই, আমাকে যেতেই হবে।

- হ্যাঁ, অবশ্যই যাবে। আমি সব ব্যবস্থা করে দেবো। তুমি এখন বিশ্রাম নাও। আমি স্নান সেরে একটু বেরবো।

- তুমি কি অফিস যাবে?

- না আমি আপাতত ছুটিতে আছি। আগামী সপ্তাহে জয়েন করবো।

স্নান খাওয়া সেরে তিমির বেরিয়ে পড়ে। সৌমিকের জন্য কয়েকটি জিনিস এবং বাড়ির কিছু দরকারি জিনিসপত্র কিনে ব্যাঙ্কের কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে শুনতে পায় - নগেন ঠাকুর ভীষণভাবে আহত হয়েছেন। ঠিক কী ঘটনা ঘটেছে জানার জন্য তিমির মন্দিরের দিকে পা বাড়ায়।

ভোরবেলা স্নান সেরে মন্দিরে গিয়ে পুজোয় বসার পর পর-ই ঠাকুরমশাইয়ের মাথার ওপর যে ঘন্টাটি ঝোলানো ছিলো সেটা খুলে মাথায় পড়ে। ঘন্টার আঘাতে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যায়। তার সহকারী তপন তৎপরতার সঙ্গে গাড়ি ডেকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে। অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বাঁচার সম্ভাবনা খুবই কম।

তিমিরের মনটা বিষন্ন হয়ে গেল। ভেতর থেকে একটা চাপা কান্না ঠেলে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। ঠাকুরমশাইয়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ভোরবেলার কথাগুলো ওকে বড্ড পীড়া দেয়, একটা বাস্তব প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় - তাহলে কী -? ঘটনাটা কাকতালীয় হলেও মনের ভেতরটা খচখচ করতে থাকে।

সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির থেকে কয়েক পা গেলেই তিমিরের নিজের বাড়ি। বিষন্ন মনে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

সৌমিকের জন্য দুটো টি-শার্ট, জিনস প্যান্ট এবং আন্ডারওয়্যার নিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেখে সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আশা মাসি রান্নাঘরে দুপুরের খাবার তৈরীতে ব্যস্ত। জিনিসপত্রগুলোকে টেবিলের পাশে রেখে ওর ডায়েরিটা নিয়ে বারান্দার দোলনায় গিয়ে দিনলিপি লিখতে বসে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পরপর সাজিয়ে লিখে ফেলে। নগেন পুরোহিতের মৃত্যুটাকে মেনে নিতে বড্ড কষ্ট হয় - পুরুতঠাকুরের মৃত্যুর জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হয়। কাকভোরে একজন মৃতপ্রায় মানুষকে কাঁদার পাঁক থেকে তোলার জন্য সাহায্য না করায় তিমির ঈশ্বরের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছিল। হয়তো তারই জন্য - না, আর কিছু ভাবতে পারে না।

লেখা বন্ধ করে দু'হাতে মাথা চেপে ধরে নদীর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। নদীই ওর একমাত্র সান্ত্বনা। কিছুক্ষণ আগেও নদীর বুকে যে ঢেউটা ক্রমশ ফুঁসে উঠছিল সেটা এখন পুরোপুরি শান্ত। সে যেন তিমির কে কিছু বলার চেষ্টা করছে - কিচ্ছু ভেবোনা বেটা। সবটাই প্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত, এখানে তুমি আমি সবাই নিমিত্ত মাত্র। বৃথা কষ্ট পেওনা। এই দেখো না, তুমি আমাকে এত ভালোবাসো, সবাই কি তোমার মতো? তুমি যেমন আমাকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করো তেমনই কেউ কেউ আমাকে মেরে ফেলার চক্রান্ত করে। ওরা জানে আমি মরে গেলে সভ্যতা মরে যাবে, তবুও -

- কী ব্যাপার এখানে একা একা বসে কী এত ভাবছো? দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো।

- ও, তুমি উঠেছ? তুমি ঘুমিয়ে ছিলে তাই তোমাকে ডাকিনি। অনেক বেলা হয়ে গেছে। চলো আমরা এবার লাঞ্চটা সেরে ফেলি। বিকেলের দিকে কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল দেখাতে নিয়ে যাবো।

সূর্য ওঠার আগেই সৌমিক ঘুম থেকে উঠে পড়ে। আজই ওকে মকবুল ভাইয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়তে হবে। অনেক চেষ্টা করেও মনটাকে বেঁধে রাখতে পারছে না। এখানে এসে তিমিরের সাথে মিশে ওর বেশ ভালো লেগেছে। সমবয়সী হওয়ায় একে অপরকে খুব সহজেই বুঝেছে। ভীষণ আবেগপ্রবণ, সহমর্মি এবং কোমলমতি তিমির বারান্দায় বসে ভোরের শান্ত স্নিগ্ধ শীতল স্পর্শে নিজের পৃথক সত্তা তৈরী করে। ওর কাছে জীবনের অর্থ আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতো নয়।

তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। তিমিরের দেওয়া জিনিসপত্র একটা ব্যাগের ভেতর আগেই গুছিয়ে রেখেছিল সৌমিক। বারান্দায় এসে তিমিরকে বলে - বন্ধু এবার আমাকে যেতে হবে।

- আজই যাবে? যাও, তোমাকে আটকাবো না। যে মহান ব্রতে তুমি দীক্ষিত তা তোমাকে পূর্ণ করতেই হবে। চলো, আমি তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।

ওরা দু'জনে বেরিয়ে নতুন বাসস্ট্যান্ডে আসে। বাসে তুলে দিয়ে তিমির ওর হাতে কিছু টাকা গুঁজে দেয় এবং বলে - সাবধানে থেকো।

- তুমিও সাবধানে থেকো। একবার যখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি তখন আমার আর কোনো ক্ষতি হবে না, আশা করি। তোমাকে চুপিচুপি বলে যাই - সমাজের বেশির ভাগ অংশই পচে গেছে। তার কটু গন্ধ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। যেভাবেই হোক এই কটুগন্ধী সমাজকে জঞ্জাল মুক্ত করতে হবে। কিন্তু আমি একা একা তো এতবড় কাজ করতে পারবো না। তাই গ্রামের পথে মানুষের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছি। মানুষের মধ্যে মিশে গিয়ে আমিও মানুষ গড়ার কারিগর হতে চাই। সম্ভব হলে তুমিও এসো।

কথাটাকে বুকে নিয়ে বাস থেকে নেমে আসে তিমির। ধীরে ধীরে বাস চলতে শুরু করে। তিমির ধীর পদক্ষেপে বাড়ির পথ ধরে। আকাশে ছড়িয়ে পড়া সোনালী রোদ তিমিরের মনে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হয়ে জ্বলে - কটুগন্ধী সমাজ, মানুষ গড়ার কারিগর।

(ক্রমশ)