আমাদের শিলংয়ের বাড়ীর বিশাল হলঘরটার একদিকে ছিল পুরো দেওয়াল জোড়া কাঁচের জানলা। বাড়িটা উঁচুতে বলে সারা শিলং শহরটা দেখা যেত। মনে পড়ে, একদিন তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। ভারী ব্রোকেডের পর্দাগুলি টানতে গিয়ে দেখি, নীচের সারা শহরটি যেন রূপকথার পরীর রাজ্য। একটি একটি করে তারা ফুটে ওঠার মত, বাতি জ্বলে জ্বলে উঠছে। আকাশেও তখন নির্মেঘ আঁধারে লক্ষ লক্ষ তারা উঠেছে। বড় গীর্জাটার থেকে ভেসে আসছে, সান্ধ্য-প্রার্থনার ঘণ্টাধ্বনি। ঘরের মধ্যে ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে, পাইনকাঠের মিষ্টি একটা গন্ধ। সে দৃশ্য আজও ভুলিনি।
শিলংয়ের কথা বলতে গেলে, সেখানকার স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি এগুলি না বললে কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শিক্ষায় নিবেদিত প্রাণ, যে সব শিক্ষকদের সেখানে পেয়েছি, তাদের কথাও কখনো ভুলবো না। 'সেন্ট এডমান্ডস' (St. Edmunds) এমনি এক শিক্ষায়তন। এটি আইরিশ ব্রাদার্সদের দ্বারা পরিচালিত একটি মিশনারি স্কুল। এদের অন্য স্কুলগুলি হলো, দিল্লীর St. Columbus ও কলকাতার St. Josephs। বিধাতার অকৃপণ আশীর্বাদে আমার ছেলেরা এমনই এক বিদ্যালয়ে পড়বার সুযোগ পেয়েছিল। সেই সর্বাঙ্গসুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা, যা এক ছাত্রকে মানুষের মত মানুষ করে তৈরী করে, জীবনের পথে চলতে শেখায়, তার কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ।
বিস্তীর্ন খেলার মাঠ, সব রকম খেলাধুলার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, সবই ছিল। মনে পড়ে ব্রাদার গ্যাফনিকে, যিনি স্কুল অধ্যক্ষ বা Principal ছিলেন। অত শত ছাত্রের প্রত্যেকের নাম জানতেন তিনি। প্রতিটি ছাত্রকে আলাদা যত্ন নেওয়া হতো। স্কুলটি মূলতঃ বোর্ডিং স্কুল। হাতে গোনা দুএকটি ডেস্কয়ালার ছাত্র ছিল। আমার ছেলেরা, তাদের আজকের সফল জীবনের জন্য, এই সব ছাত্রপ্রাণ শিক্ষকদের কাছে ঋণী। তারা সে কথা এখনো ভোলেনি।
ছোট জায়গা বলে শিলংয়ে প্রায় সবাই সবাইকে চিনত। জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়লে আমাদের বাড়ীতে হঠাৎ করে পার্টি ও আড্ডা বসত। অনেক রাত অবধি চলত খান পিনা। বহু বিচিত্র মানুষের সমাবেশ হত। প্রটোকল ইত্যাদির বালাই ছিল না। শিলং ক্লাব ছিল আর এক আড্ডাস্থল। পুরো মেঘালয় গভর্মেনটের ক্যাবিনেট সেখানে আড্ডা দিতে যেত। ফলে সবাই আমাদের দারুন বন্ধু হয়ে গিয়েছিল। স্পিকার ছিলেন রাধন সিং লিংডো। সন্ধ্যেবেলা ক্লাবে ঢুকলেই তার দেখা পাওয়া যেত। এখনো তার কথা কানে বাজে, "বাবলু, come to the bar, শেষের কবিতা শুনাউ"। খাসি ভদ্রলোকের মুখে বাংলা আর শেষের কবিতা শুনে খুব অবাক লাগত।
ওখানে রাজভবনটি ভারী সুন্দর ছিল। গভর্নর ছিলেন L. P. Singh। শেষ ICS-দের একজন ছিলেন। সাতটি রাজ্যের রাজ্যপাল ছিলেন তিনি। ব্রিলিয়ান্ট লোক। তখন তাঁর অনেক বয়স, কিন্তু কি চমৎকার বলরুম নাচ করতেন ! আশ্চর্য হয়ে যেতাম। মুখ্য মন্ত্রী ছিলেন উইলিয়ামসন সাংমা। তিনি আবার আমার বাড়ীর বাঙালী মাছের ঝোল খেতে খুব ভালোবাসতেন। আমার বাড়ি হঠাৎ করে পার্টি আর আড্ডা হলেও, সেখানে এঁরা সবাই এসে পড়তেন। open house আর কি। কত যে মজার মজার ঘটনা ঘটছে ! আজ সেগুলি শুধুই সুখস্মৃতি।
(ক্রমশ)
