বিবিধ

কৃষ্ণনগরে কাজী (পঞ্চত্রিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



ইনাস উদ্দীন


[১৯২৬ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে কবি সপরিবার কৃষ্ণনগর এসেছিলেন, এনেছিলেন হেমন্তকুমার সরকার। কবিকে কেন এনেছিলেন তিনি? শুধুই বন্ধু বলে? প্রতিভাবান কবি বলে? মাস ছয়-সাতেক গোলাপট্টিতে থেকে কবি গ্রেস কটেজে আসেন। ঠিক কবে আসেন তিনি? জুলাই, নাকি আগস্ট? কেনই বা এলেন এই বাড়িতে? ভীষণ দারিদ্র্যের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে নির্জন এক প্রান্তে? অনেক কিছুই আমরা জানি না, জানাও যায় না। এখান-ওখান থেকে জোগাড় করা তথ্য আর তার সাথে খানিক অনুমান মিশিয়ে টুকরো কথার কিছু দৃশ্য সাজিয়ে তোলার চেষ্টা এই কাহিনীতে।]

পর্ব - ৩৫

উৎকণ্ঠা আর মনখারাপের রাত একসময় ভারি হয়ে এলো। হ্যারিসন রোডের মতো কলরোলে মুখর হয়ে থাকা সন্ধ্যা আগে থেকেই নিশ্চুপ হয়ে ছিল। রাত্রি গভীরে একসময় কথাবার্তা বন্ধ হয়ে এলেও উভয় তক্তপোষে এপাশ-ওপাশ হবার শব্দ দুই বন্ধুর নিদ্রাহীনতার জানান দিচ্ছিল। সাম্প্রদায়িক মারামারি এর আগেও বহু জায়গায় বহুবার ঘটেছে। কিন্তু এবারের ঘটনার যা চরিত্র তা যেন সন্মুখে বাংলা তথা ভারতের ভাগ্যাকাশে ঘোরপ ঘনঘটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। মুজফফর আহমদের কাছে নজরুল ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিবরণ শুনেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই জাতিগত, বর্ণগত কিংবা শ্রেণিগত বিদ্বেষ কাজ করেছে, কিন্তু প্রত্যক্ষ রাজনীতির পরিকল্পিত হস্তক্ষেপ বিশেষ কার্যকর হয়নি। এবারে যেন প্রথম সারির নেতারা জেনেশুনে আগুন নিয়ে খেলতে নেমেছেন। পরদিনের কাগজ হাতে নিয়েই তার ছবি স্পষ্ট ফুটে উঠল।

সকালে একটু বেলাতেই ঘুম ভাঙল। বারান্দায় এসে উঁকি দিয়ে মুজফফর আহমদের মনে হলে অল্প হলেও মানুষজনের চলাচল শুরু হয়েছে। আমহার্স্ট স্ট্রিটের মোড়ে জটলার আভাস দেখে অনুমান হলো চায়ের দোকান খুলেছে। দুজনে বেরিয়ে পড়লেন। পরিস্থিতি বোঝার জন্য বাইরে বেরোনোর জন্য দুজনেই উসখুস করছিলেন। তাছাড়া অভিজ্ঞতা থেকে মুজফফর আহমদের একটা বিশ্বাস ছিল - বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের উদবিগ্ন হবার তেমন কারণ নেই। আনন্দবাজার, অমৃতবাজার, দৈনিক ছোলতান, দ্য বেঙ্গলিসহ 'অসর-ই-জাদিদ' নামে একটা উর্দু কাগজও কিনলেন।অমৃতবাজার কয়েক বছর ধরেই উস্কানিমূলক লেখা ছাপিয়ে চলেছে। কিন্তু আনন্দবাজারের সংবাদ ও সম্পাদকীয় উপস্থাপনার ধরণ দেখে মুজফফর আহমদ অনেকটাই হতাশ হলেন। সুরেশবাবুর মতো সুশিক্ষিত সজ্জন মানুষও যদি এরকম মুসলিম বিদ্বেষপূর্ণ লেখা প্রকাশ করেন তাহলে এই বিষাক্ত আগুন আর অবাঙালির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। একমাত্র 'দ্য বেঙ্গলি' অনেকটা বিস্তারিত এবং মনে হলো নির্ভরযোগ্য রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। পুলিশ সূত্রে সাতজন নিহতের সংবাদ পাওয়া গিয়েছে, তার মধ্যে পাঁচজনই মুসলমান। উভয় পক্ষে আহতের সংখ্যা আনুমানিক একশতের কাছাকাছি। মৃতদের মধ্যে দুজন কোচওয়ান, ভিস্তিওয়ালা, ফলবিক্রেতা প্রভৃতি পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ এরা খুবই নিম্নবর্গের দরিদ্র মানুষ। কিন্তু যে ভাষায় এদের হিংস্রতা তুলে ধরা হয়েছে তাতে সাধারণ বাঙালি হিন্দুর মনে ক্ষোভ জন্মানো অতি স্বাভাবিক। ছোলতান তো খোলাখুলি জানিয়েছে যে, এতোকাল ধরে বঙ্গের মুসলমানদের তারা সতর্ক করে আসছে। আর্যসমাজীরা দোকানে মুসলমান কর্মচারী রাখা বন্ধ করেছে, গো-রক্ষা সমিতি করে হাওড়া ও দমদমের দুটো বড়ো গোরুর হাট বন্ধ করে দিয়েছে। দিকে দিকে বাংলার মুসলমানদের আমরা সতর্ক করেছি, বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে আমাদের কথায় আপনারা কর্ণপাত করেনি। ঢাকা ও পাবনায় মুসলমানরা সাহা ব্যবসায়ী ও জমিদারদের জমিতে বেগার দেবে না, তাদের বাড়ির কোনও কাজ করবে না বলে সংবদ্ধ হয়েছে। এপার বঙ্গের মুসলমানরা সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেনি ইত্যাদি। মুজফফর আহমদ 'অসর-ই-জাদিদ' খুলে পড়তে লাগলেন। নজরুল উর্দু ভালোই পড়তে জানেন, কিন্তু মুজফফর আহমেদ এ বিষয়ে বেশি অভিজ্ঞ। কয়েকমাস সরকারি চাকরিতে ঢুকে উর্দু থেকে তরজমার কাজ করেছেন। সম্পাদকীয় সহ গতকালের ঘটনার বিভিন্ন রিপোর্টে পুরো কাগজ ভর্তি - সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু বক্তব্যের পরতে পরতে মুসলমানদের জিহাদি হবার উস্কানি। দাঙ্গায় হত সাতের মধ্যে পাঁচজনই মুসলমান - তাদের তুলে ধরা হয়েছে আল্লার রাস্তায় গাজী মুসলমান। সাচ্চা মুসলমান কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইতে জানের পরোয়া করে না। বুক পেতে শহিদ হয়। বাঙালি মুসলমানরা ডরপোক, তারা দ্বীন ইসলামের কথা ভাবে না, তাদের ভরসায় থাকবেন না ইত্যাদি। একজায়গায় খোদার নিকট প্রার্থনা জানানো হয়েছে - হে প্রভু, এই বাংলায় ওমর এবং খালিদের মতো বীরদের একবার পাঠাও। তাঁরা এই ডরপোক মুসলমানদের উজ্জীবিত করুক। সাধারণ উর্দু পড়া মুসলমানের মনের অবস্থা কেমন হবে ভাবতে পারছেন নিশ্চয়।

- এক শ্রেণির মুসলমান তো এরকম কথা বহুকাল থেকেই বলে আসছে। মুখস্থ কেতাবের বাইরে তাদের জগত নেই।

- বলে আসছে বটে, কিন্তু ইদানীং ধরণ বদলেছে। মাত্র তিনমাস হলো কলকাতায় আসা, এর মধ্যেই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। আফগানিস্তানের শাসক এসে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ তাড়িয়ে ইসলামী শাসন কায়েম করবে এরকম স্বপ্ন দেখার লোকও কম নেই।

- এই ক'বছরের মধ্যে বাংলার ভাগ্যাকাশে এরকম ঘনঘোর অন্ধকার কী করে সৃষ্টি হলো ভাবতে অবাক লাগে। মানুষ শিক্ষিত হচ্ছে কি আরো অমানুষ হবার জন্যে?

- অবশ্যই! শিক্ষার প্রথম স্তরে মানুষ আগে ধর্মপুস্তক বেশি পড়ে, সেই জ্ঞান নিয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করুন - মুসলিম উগ্রবাদী পত্র-পত্রিকার প্রসার হয়েছে। শিক্ষার দ্বিতীয় পর্বে, অর্থাৎ পড়াশোনার গভীরতা আরেকটু বাড়লে তখন মানুষ যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে ভাবনা শুরু করে। ইদানীং ঢাকায় একটা প্রগতিশীল সমাজ তৈরি হচ্ছে সে খবর তো আপনিও ভালোই জানেন। তবে ঠিকই বলেছেন - বাংলার এটা সত্যিকারের দুর্ভাগ্য। এই যে উর্দু কাগজে কাফের হত্যার জিহাদি আহ্বান জানানো হচ্ছে, এগুলো বাঙালি হিন্দু-মুসলমান বলতে গেলে জানতে পারছে না। দেওবন্দ ও বেরিলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অহরহ আলেম মৌলানারা আসছেন। মসজিদে, মাদ্রাসায়, জলসায় কখনো প্রকাশ্যে কখনো গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করে উগ্রতা ছড়াচ্ছেন। ক'বছর আগেও কি আঞ্জুমানে ইসলামিয়া, তাঞ্জিমুল মুসমান, জমিয়তে উলেমা প্রভৃতি ধর্মীয় সংগঠনের নাম শুনেছেন। এরা রীতিমতো নির্দেশিকা জারি করে প্রচার করছে যে জন্মাষ্টমী, হোলি প্রভৃতি অনুষ্ঠানে কোনও ভাবে যোগ দেবেন না। এরকম উপলক্ষে কোনো খাওয়া-দাওয়ায় অংশগ্রহণ করবেন না। নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের জন্য শহরাঞ্চলে ঢোল কাঁসির প্রচন্ড আওয়াজ সহ সারারাতের কাওয়ালীর আয়োজন হচ্ছে। পালটা হিন্দুসভার নাম দিয়ে অষ্টপ্রহর ষোলপ্রহর কীর্তনের আয়োজন হচ্ছে। কাওয়ালী-কীর্তন আগেও হয়েছে, হওয়াও দরকার। আপনি গানের মানুষ আরও ভালো বুঝবেন। উভয়ক্ষেত্রেই সূফী ভক্তিবাদের আবেগ থাকে। কিন্তু বর্তমানে সেগুলো কৌশলে বিদ্বেষ প্রচারের ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। ১৯১৮ সালের আগে এরা বাংলায় তেমন পাত্তা পায়নি। কিন্তু এখন একদিকে উর্দু আরেকদিকে হিন্দিতে যেসব প্রচার চলছে, উভয় পক্ষে ভিতর ভিতর যে রণং দেহি ব্যাপার-স্যাপার চলছে - বাংলার ভাগ্যাকাশ সত্যিই দুর্ভাগা - অধিকাংশ বাঙালি হিন্দু-মুসলমান সেটা জানতেও পারছে না। কিন্তু বিপুল ক্ষতি হয়ে চলেছে বঙ্গের ৯৮ শতাংশ বঙ্গভাষী হিন্দু-মুসলমানের। মানবেন্দ্রবাবু এটাই বলতে চেয়েছিলেন।

কাগজের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে নজরুল এক জায়গায় থমকালেন। অমরেন্দ্র চক্রবর্তী নামের একজনের দু'লাইনের একটি বক্তব্যও উদ্ধৃত হয়েছে।

- ইনি কি সেই অমরেন্দ্র বাবু, উত্তরপাড়ার মানুষ, কংগ্রেসের বিপ্লবপন্থী গোষ্ঠীর সক্রিয় নেতা? নজরুলের সংশয়।

- হ্যাঁ, তিনিই।

- হুগলিতে প্রায়ই তার সাথে দেখা কথা হতো। তিনি হঠাৎ এরকম হিন্দু জাগরণী মন্তব্য করছেন? আশ্চর্য তো! নজরুল বিস্ময় প্রকাশ করলেন।

মুজফফর আহমদ বন্ধুর দিকে খানিক চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। কিছুটা যেন নিস্পৃহ গলায় বললেন, আপনার তো আশ্চর্য হবার কথা নয়। অমরেন্দ্র বাবু নিজে কোনো সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে যুক্ত নন। কিন্তু এই ধারায় যুক্ত যুবকবৃন্দকে নিয়ে 'কংগ্রেস কর্মীসংঘ' গড়ে তুলেছেন এবং তাদের মধ্যে সনাতনী হিন্দু জাগরণের প্রচার করে চলেছেন।

- কিন্তু বিপ্লবীরা তা শুনবে কেন? তাদের বিপ্লব তো দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য, পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচনই তো তাদের মূলমন্ত্র!

- সেটা তো সত্য। কিন্তু একটা সূক্ষ্ম ফাঁক আছে সেটা নিশ্চয় আপনার মতো দ্রষ্টা কবি খেয়াল করেছেন। 'অনুশীলন সমিতি' কিংবা 'যুগান্তর'-এর মতো সংগঠনের কর্মীরা প্রায় সকলেই মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক। ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বদেশকে মুক্ত করাই তাদের মূল ব্রত।কালীমন্দিরে গীতায় হাত রেখে শপথ গ্রহণ, দেশকে মাতৃরূপে বন্দনা, আনন্দমঠকে উজ্জীবন গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করা - এসবের মধ্যে পুরো হিন্দুয়ানি ব্যাপার থাকলেও এটা তাদের কাছে অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি। কারণ তাদের ভিতর অন্তত মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ ছিলনা - সেটা আমার উপলব্ধি। এমনকি মুসলিম সমাজের মানুষজনের কাছেও এটা ততটা গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। নিজের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী শপথ নেবে সেটা তো স্বাভাবিক। জেলখানায় তাদের সঙ্গে তো দীর্ঘদিন কাটিয়েছি। কিন্তু বিগত ক'বছর সশস্ত্র বিপ্লবী সংগঠনগুলির কর্মীদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে মুসলমানরাই দেশের মূল শত্রু। ব্রিটিশ গেলে তারা আবার মুঘল বা নবাবী আমলের মতো দেশ দখল করবে।

মসজিদে মসজিদে জুম্মায় লিফলেট বিলি করা হচ্ছে, পরিকল্পিত ভাবে অবাঙালি মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার কাজ চলছে। ইসপাহানী ব্যবসায়ীরা টাকার যোগান দিচ্ছে বলেও খবর। অমরেন্দ্র বাবুরা এইসব লিফলেটকে হাতিয়ার করে প্রচার চালাচ্ছে - দেশবন্ধুর বেঙ্গল প্যাক্ট বাংলায় সংখ্যালঘু হিন্দুদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে। সুভাষ বাবুরা কলকাতা কর্পোরেশনের ক্ষমতায় বসে এক ধাক্কায় ৭০-৮০ জন মুসলমানকে চাকরিতে বহাল করেছিলেন। ব্যাপারটা অনেকেই তো ভালো চোখে দেখে নি। মানবেন্দ্র রায়ের কথাটাই বারবার ভেসে উঠছে - এই বেঙ্গল প্যাক্ট বাংলার কাল হয়ে দাঁড়াবে।

সারাদিনে নানারকম খবরাখবর ভেসে এলো। গুজব ছড়াতে সময় লাগে না। সত্য মিথ্যা যাই থাক - দফায় দফায় দুই পক্ষে বিভিন্ন পাড়ায় হামলা চলতেই আছে তা বোঝা যাচ্ছে।

বিকেলের দিকে রাস্তায় লোকজনের চলাচল কিছুটা বাড়ল। সন্ধ্যা নামার আগেই তাদের অবাক করে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর এসে ঢুকলেন।

- একি, স্বচক্ষে দাঙ্গা দেখার জন্য কাজীও এসে পড়েছে দেখছি! ভাবলাম মুজফফর সাহেব একা একা দুইদিন ধরে কী করছেন দেখে আসি।

- না, একাকীত্ব কাটানোর জন্য ঠিক সময়েই কাজী সাহেব এসে উপস্থিত হয়েছেন। সারাদিন দুইজনে নানান রকম খবর শুনছি। আপনি এসে পড়েছেন, এবার আসল খবর পাওয়া যাবে। মুজফফর আহমেদ বললেন।

- খবরের আসল-নকল বলে কিছু নাই। দুই পক্ষেই বস্তিবাসী মানুষেরা মারামারি করছে, রক্তারক্তি হচ্ছে, ঘরবাড়ি উচ্ছেদ হচ্ছে এটাই খবর। আজ বেলার দিকে হঠাৎ একদল বস্তিবাসী মুসলমান বৌ-বাচ্চা নিয়ে জোড়াসাঁকোয় আমাদের বাড়ির সদরে ঢুকে পড়ে। রবিকাকার নির্দেশে ওদের ভিতরে ঢুকিয়ে সদর বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রথম দেখলাম বড়বাজার থেকে লাঠিসোটা নিয়ে একদল সদরের সামনে এসে হৈচৈ শুরু করে দিল। আমরা দুজন উপরের বারান্দা থেকে ওদের বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ওদের মুখচোখে অদ্ভুত ক্রোধ। আশ্চর্য যে ওরাও কিন্তু সাধারণ দরিদ্র বস্তিবাসী। যাইহোক, আশেপাশে পুলিশ টহল ছিল। তারা এসে ওদের হটিয়ে দেয়।

- জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেও আক্রমণ! নজরুলের চোখে বিস্ময়।

- আশ্চর্যের আরও অনেক কিছু বাকি আছে ভাই। যা শুরু হয়েছে সহজে এর নিরসন হবে বলে মনে হয়না।

ঘন্টাখানেক কথাবার্তা বলে সৌমেন্দ্রনাথ বিদায় নিলেন। মুজফফর আহমেদ নিজেই তাগাদা দিলেন। সময় তো ভালো নয়।

নজরুলের খুব ইচ্ছে ছিল কল্লোল অফিসে একবার গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসার। কাছেই তো। দীনেশরঞ্জনকে তো পাওয়া যাবে। শৈলজাকে কথা দেওয়া আছে, পয়লা বৈশাখ 'কালিকলম'এর আত্মপ্রকাশ। সেখানে অবশ্যই কাজীর লেখা চাই। মুরলীদা ইতিমধ্যেই চারিদিকে কালিকলমের কথা ভালো করে ঘোষণা করে দিয়েছে। প্রথম সংখ্যায় কাজীর লেখা থাকবে না, তাই কি হয়। নজরুল একটা অন্যরকম কবিতাই ওদের জন্য সঙ্গে এনেছেন - মাধবী-প্রলাপ। শৈলজার অভিযোগ ছিল বিপ্লবী জাগরণী কবিতা ছাড়া কাজী আর কিছু লিখছে না - এই অপবাদ ঘোচাতেই বোধহয় ভিন্ন স্বাদের লেখাটি লিখে ফেলেছেন, মনের অনুভবকে কোথাও লাগাম টেনে ধরেননি। কিন্তু মুজফফর সাহেব বাধা দিলেন - এখন পাড়ার ভিতরে অলিগলিতে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। তাছাড়া এইসময় তেমন কাউকে পাওয়াও যাবেনা। নজরুলের শৈলজানন্দ ছাড়া অন্য কারো হাতে লেখাটি দেবার ইচ্ছে নেই। মুজফফর আহমদের হাতে দিয়ে গেলে হয়ত চলত। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে 'মাধবী-প্রলাপ'কে কৃষ্ণনগরেই ফেরত নিয়ে যাবেন ঠিক করলেন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের দুমাসও বাকি নেই। সরোজিনী নাইডু সহ অনেক বড়ো নেতারা আসবেন, আসাম সহ বঙ্গের প্রতিনিধিরা থাকবেন। নজরুলের অনেক দায়িত্ব। এর মধ্যে আবার সিলেট যাবার আমন্ত্রণ পেয়েছেন নজরুল, উৎসাহিতও বটে। মুজফফর সাহেব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খবর নিলেন। কারণ হেমন্তবাবু অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি। ইতিমধ্যে কংগ্রেসের বাইরে এসে দলগঠনের ব্যাপারটা কংগ্রেসের নানা-মহলে সমালোচিত হচ্ছে।

পরদিন ভোরবেলার ট্রেনে মুজফফর আহমদ বন্ধুকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এলেন। ট্রেন ছাড়ার আগে বললেন, সিলেট না গেলে যদি হয় তাহলে ছেড়ে দিন। শরীরে ধকল পড়বে।

নজরুলের ঠোঁটে পুরনো খামখেয়ালি হাসির রেখা। বললেন - দেখা যাক।

গোটা প্ল্যাটফর্ম কালো ধোঁয়া আর কয়লার কুচি ছড়িয়ে লালগোলা প্যাসেঞ্জার বিকট হুসহাস গর্জন করতে করতে লোহার পাত ধরে ধরে এগোতে লাগল।

(ক্রমশ)