দীপন শুক্রবারে কলেজ থেকে পিজিতে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে কলেজ মোড় থেকে বাস ধরে। বাড়ি ফেরে শিয়ালদহ থেকে সন্ধ্যে সাতটা চল্লিশের ট্রেন ধরে। ট্রেনটা একদম ফাঁকা থাকে। ল্যাপটপের ব্যাগটা বুকে জাপটে ধ'রে চোখ বন্ধ করে থাকে। কানে হেড ফোন গোঁজা। কল্যাণী পর্যন্ত লোক ওঠানামা করলেও; পরের স্টেশন থেকে দুই/একজন নামলেও কেউ ওঠে না বললেই চলে। হট্টগোলহীন কামরায় ট্রেনের দুলুনিতে ঘুম এসে যায়। স্টেশনে দাঁড়ালে আলোর তীব্রতায় চোখ মেলে দেখে নেয় কোন জায়গায় এল। স্টেশনগুলো ফাঁকা। কিছু কুকুর গড়াগড়ি দিচ্ছে অথবা বুকের মধ্যে মুখটা গুঁজে চোখ বন্ধ করে আছে। ভিখারি বা ভবঘুরেরা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে; অথবা তার স্থাবর-অস্থাবর জিনিস গুছিয়ে ছেঁড়া নোংরা বিছানার চাদর বা কম্বলে শরীরটা ঢেকে নিচ্ছে। ঝুড়ির তলানিটুকু খালি করার জন্য ফল বিক্রেতাদের হাকডাক। রাত্রের জনবিরল স্টেশন ছেড়ে অন্ধকার প্রান্তর ফুঁড়ে ছুটে চলা কামরায় হু হু করে হাওয়া ঢোকে। পতপত করে ওড়া চুলে হাতের আঙুল চালিয়ে পিছনে ঠেলে দেয়, দীপন। সেই দুপুরে কলেজ ক্যান্টিনে খাওয়া। খুব খিদে লাগলেও হকারদের কাছ থেকে কোনদিন কিছু কিনে খায় না। শেষ পর্যন্ত একজন/ দুইজন যাত্রী থাকে। গ্রীষ্ম বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত ও বসন্তে রাত্রে ফেরার অভিজ্ঞতা বৈচিত্র্যেময়। গন্তব্য যত এগিয়ে আসতে থাকে, খিদেটা ততটা তীব্র হয়ে ওঠে। ফোনে মায়ের কাছে জেনে নেয় কী রান্না হয়েছে? পছন্দের পদ থাকলে তো কোনো কথা নেই। না, হলে খিদেটাকে বেশি পাত্তা দেয় না। ধ্যুস! পাঁচদিন পিজির বিস্বাদ খাবার খেয়ে জিবটায় যেন নষ্ট হয়ে গেছে। তার মনে হয়, মা ইচ্ছে করেই অপছন্দের রান্না করেছে। সবসময় কড়া শাসনে রাখতে চাই। ও এখন অ্যাডাল্ট। নিজস্ব মতামত আছে। মায়ের খবরদারিটা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। মাকে কম ভালোবাসে; তার তো নয়, কিন্তু কথা বলতে গেলেই কথা কাটাকাটি হয়ে যায়। মায়ের সঙ্গে তর্ক করতে যে ভালো লাগে, তাও নয়। রেগে গেলে মাথা গরম হয়ে যায়। পরে আফশোশ হয় উল্টোপাল্টা বলে ফেলার জন্য। আসলে মায়ের উপর অভিমানের পাহাড় জমে আছে। শুধু অভিমানের পাহাড় নয়; আরও গভীর গূঢ় কারণ আছে! যা কোনোদিনই প্রকাশ করতে পারবে না। ভুলেও থাকতে চাই, কিন্তু যখন মা নীতির কথা বলে জ্ঞান দেয়, বুনো রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
দীপনের বদ্ধমূল ধারনা তার মায়ের সকলের জন্য সময় আছে; শুধু তার জন্য নয়। ওর মায়ের দাবি - বড়ো ও ছোটোর জন্য একই সময় দিয়েছে। তারতম্য তো কিছু হয়নি। দীপন মায়ের যুক্তি ধোপে টিকছে দেয় না। কড়া ভাবেই বলে দেয়,
"কখনোই নয়। আমাকে কম ভালোবাসো। আজ পর্যন্ত বলতো, আমার কোন কাজটি ঠিক বলে মনে হয়েছে তোমার? দাদার সবকিছু ভালো। আমার নামে সবার কাছে শুধু নিন্দে করে বেড়াও। কর্তব্য পালন আর ভালোবাসার মধ্যে অনেক ব্যবধান। সত্যি করে বলতো, সঠিক প্যারেন্টিং করতে পেরেছো? পারোনি। তোমাদের নিজেদের গণ্ডগোল মেটাতে পারলে না আজ পর্যন্ত! আমাকে জ্ঞান দিতে এসো না।"
দীপন জানে এসব বলার রেস চলবে দু'তিনদিন ধরে। ওর মা কথাবার্তা বন্ধ করে বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকবে। কেঁদেকেটে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলবে; নয় তো বেশি করে দীপনকে তোয়াজ করবে। লক ডাউনের পর থেকে ওর মা ধরনটা পাল্টে ফেলেছে। গ্রুপ তৈরি করেছে হাঁটতে যাওয়ার সঙ্গীদের নিয়ে, স্কুল-কলেজের সঙ্গীদের নিয়ে।
স্কুল-কলেজের বান্ধবীদের সঙ্গে এই শীতে তাদের ছাদে পিকনিক করল। হা হা হি হি হাসি-গল্পে কলেজ ক্যাণ্টিন করে তুলেছিল। সেদিন দীপন ঘরের দরজা বন্ধ করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিল। ঠাম্মীর গজগজানি শুনে একবার মনে হয়েছিল মাকে গিয়ে বলে আসে হৈ চৈ একটু কম করতে, পারেনি। মার প্রেস্টিজে লেগে যাবে, পরে শোধ তুলবে। তার থেকে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকাটায় বেটার। অথচ ওর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে যাওয়া নিয়ে এত আপত্তি কেন? ওর মার ধারনা - এখনকার ছেলেমেয়েরা, কেউ কারো বন্ধু নয়, সব বন্দুক। একটু কিছু হলেই ফায়ার।"
দীপন মানতে নারাজ নয়। এটা ঠিক,ওদের এই প্রজন্ম টলারেট করতে চাই না। ভুরিভুরি উদাহরণ ওর মা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে প্রমাণ করে সবকিছু নষ্টের মূল অসহিষ্ণুতা। দায়িত্বহীন অধিকার ভোগ। পাওয়ার অধিকারটুকু নিয়ে যেন পৃথিবীতে এসেছে। তাৎক্ষণিক ভালো লাগার ঘোরে নিমগ্ন। চাহিদায় টান পড়লে মরিয়া হয়ে ওঠে। ক্ষোভের বিষোদ্গারে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। এতে কোন ভালোটা হচ্ছে? বিগত দুই বছরে বাংলাদেশ ও নেপালের যা ঘটল; ইতিহাসে ন্যাক্কারজনক ঘটনার সাক্ষী ছাড়া আর কিছু নয়! চারিদিকে খুন জখম ধর্ষণের বীভৎসতা হাড় হিম করে দেয়। কেন মানুষের মধ্যে এত ক্রোধ, প্রতিহিংসা পরায়ণতা? কেনই বা একে অপরকে কব্জা করতে ন্যায়-নীতি, মূল্যবোধ জলাঞ্জলি দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করে না?
ও মায়ের চোখে চোখ রেখে পাল্টা প্রশ্ন করে, "মা, তুমি যাদের সঙ্গে মেশো, সবাই ভালো? একদম নয়। একজায়গায় হলেই শুধু পর নিন্দা-পরচর্চা। কারো কারো স্বভাব হল অন্যের হাঁড়ির খবর সংগ্রহ করে, জমায়েতে পরিবেশন করা। আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নিয়ে কী কম আলোচনা হয়! তোমাদের শাড়ি, গয়না, বেড়াতে যাওয়ার ঠাণ্ডা-গরম প্রতিযোগিতা রয়েছে। এটাও তো একটা অসুস্থতার লক্ষ্মণ। সেটা ভাবো না একবার ও। হামেশায় শুনতে হয় অন্যের ছেলে-মেয়েদের রেজাল্ট ভালো। এক একজন স্কলার। ভালো গাইয়ে, আবৃত্তিকার, ছবির আঁকিয়ে, নাচিয়ে, ক্যারেটে ও ক্রিকেটে দুর্দান্ত - এই যে তুলনা" - যা দীপনের আত্মবিশ্বাসের ভিত নড়বড়ে করে দিয়েছে। চেষ্টা করার ইচ্ছাটা শিথীল হয়ে গেছে। তাকে পিছু হটিয়েছে। একবার চেয়ে কোনদিন কিছু পাইনি তাই অন্য পথ অবলম্বন করতে হয়েছে। রাত্রে ঘুম আসে না বলেই, সকালে উঠতে পারে না। আর সকালে ওঠার মধ্যে আছে টা কী? সূর্যোদয়! ভোরের নরম আলোয় পৃথিবীর জেগে ওঠা। ফালতু যুক্তি!
দীপন মনে করার চেষ্টা করে, কবে থেকে ওর মা বান্ধবীদের সঙ্গে সময় কাটাতে শুরু করেছে। বোধ হয় ক্লাস টেন দেওয়ার পর থেকে। করোনা অতিমারিতে গৃহবন্দি থেকে মানুষ হাঁপিয়ে উঠেছিল, সেই সময় থেকে। উৎসব-অনুষ্ঠান বন্ধ। শুধু খোঁজ-খবর নেওয়া নয়; সময় কাটানোর জন্য মুঠোযন্ত্রকে আস্টেপিস্টে জড়িয়ে ধরে। তৈরি হয় বিভিন্ন গ্রুপ। fb-র রমরমা। তখন থেকে ওর মাও ধীরে ধীরে হোয়াইট আপ ও fb-তে ঝুঁকতে শুরু করে। এখন তো পুরো আসক্ত। প্রতিদিনই ছবি-রিল আপলোড করে। লাইক, কমেণ্টের আপডেট নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
ICSC-তে আশানুরূপ রেজাল্ট না হওয়ায় মায়ের কী দূর্ব্যবহার! তার আগে পর্যন্ত ওদের পড়াশোনা আর বাড়ির কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকত। দীপন থার্ড ইসু। তার পর আরও দুটো অপারেশন হয়ে গেছে। পাঁচবার কাটাছেঁড়া হয়ে গেছে। পাঁচ ছয় রকমের ওষুধ খেতে হয়।
সুলতা বলেই দিয়েছে বাকী জীবনটা শুধু সংসারের ঘানি টানবে না। নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটাবে। নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করবে। গ্রুপের সকলের জন্মদিন পালন করে শহর ছাড়িয়ে সড়ক পথের দুই ধারে গজিয়ে ওঠা রেস্টুরেন্টে/ক্যাফেতে। ১০/২০ কিলোমিটার দূরত্বে ঘুরতে চলে যায় বান্ধবীদের সঙ্গে। গ্রুপের সিংহভাগ হাউজওয়াইফ। তাদের মধ্যে অনেকেই আছে মেধাবিনী। বরেদের দাবি ছিল চাকরি করা যাবে না। চাকরি করে ঘর সামলানো আর ছেলে মানুষ - কোনোটায় হবে না। স্বনির্ভর না হতে পারার আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস পড়তে দেখেছে কতদিন মাকে। ঘরে থেকে দীপনকে মনের মতো করে গড়ে তুলতে পারল না! চলার রাস্তায় যদি দম বন্ধ হয়ে যাবার পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন পথ পরিবর্তনই শ্রেয়! নতুন পথের অভিলাষী হয় জীবজগৎ - মানুষ তো কোন ছার!
কয়েক বছরে বগুলা রোড, মাজদিয়া রোডের দুইপাশের নয়ানজুলি বুঝিয়ে মাঠের মধ্যে একের পর এক গজিয়ে উঠেছে/উঠছে ক্যাফেটেরিয়া, রেস্টুরেন্ট। লোকালয়ে ও হয়ে গেছে। রাস্তা সম্প্রসারণে দুই পাশের বৃক্ষছেদন হয়েছে নির্বিচারে। সূর্যের আলো নরম হয়ে এলে রঙিন আলোয় ঝলমল করে সড়কপথ। মৃদু আলোর টেবিল সাজিয়ে বসে টিনেজার থেকে মধ্যগগণ পেরোনো নারী-পুরুষের দল। সেলিব্রেট করতে যায় সপরিবারে, বন্ধুবান্ধব মিলে অথবা একান্তই নিকটজনকে নিয়ে। দীপন ও যায়।
দীপনের মায়েদের রবিবারে বৈকালিক আড্ডা পূর্ব নির্ধারিত কোথাও হয়ে থাকে। কখনো বা নাটক দেখতে যাচ্ছে, বিভিন্ন মেলায় ঘুরতে যাচ্ছে। দীপন তো কখনো আপত্তি করেনি। মা, কোনোদিন ওকে বুঝতে চাইলো না! পড়াশোনার বাইরে কোনো কথা নেই। এটা ঠিক হচ্ছে না; ওটা ঠিক হচ্ছে না! আর ভাল্লাগে না! ছোটোবেলা থেকে সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার জন্য আর চুল কাটা নিয়ে এত অশান্তি হয়েছে; এখনো চলে যাচ্ছে। চল্লিশ বছর আগের নিয়মে কেন চলবে, ও? এত দ্বন্দ্বের কারণ কেউ, কারো জায়গা থেকে এক পাও সরতে চাইছে না।
দীপন, ভাবনার জালে জড়িয়ে পড়েছিল। ট্রেন থামতে মাইকে লালগোলা-শিয়ালদহ ডাউন ট্রেনের ঘোষনা শুনে বুঝল কৃষ্ণনগর জং-এ পৌঁছে গেছে।
(ক্রমশ)
