বিবিধ

শত শতাব্দীর জাদুবিদ্যা (ঊনত্রিংশ পর্ব) [ধারাবাহিক]



জাদুকর শ্যামল কুমার


ভারতের জাদু ও জাদুকরেরা

জাদুকর রাজা বোস (১৮৮৬-১৯৪৮)
পিতৃদত্ত নাম - রিপেন্দ্র বোস থেকে রিপেন বোস।
নিবাস - ২২, বিদ্যাসাগর স্ট্রিট, কলকাতা।

১৯০৫ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে লিডস ইউনিভার্সিটিতে রাজা বোস চামড়ার কাজ শিখতে ইংল্যান্ডে গিয়েছিলেন। কিন্তু যাওয়ার আগেই ভাগ্য যেন অন্য কিছু ঠিক করে রেখেছিল। যে মানুষকে জাদু টানে, তার কি আর চামড়া-ব্যবসায় মন বসে? শেষ পর্যন্ত চামড়ার ব্যবসাকে প্রণাম জানিয়ে রাজা বোস লেদারের বিশেষজ্ঞ না হয়ে, হয়ে গেলেন একজন জাদুকর।

বিদেশে গিয়ে শুরু করলেন ম্যাজিকের চর্চা। মাঝেমধ্যে এখানে-সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশে, ঘরোয়া বৈঠকে, রেস্তোরাঁয় কিংবা নানা পার্টিতে শত শত মানুষের সামনে দেখাতে লাগলেন নানান ধরনের খেলা - তাসের খেলা, রুমালের খেলা, টাকার খেলা, ঘড়ির খেলা, ডিমের খেলা, আংটির খেলা, গ্লাসের খেলা, টুপির খেলা ইত্যাদি। তাই অল্পদিনের মধ্যেই অ্যামেচার ম্যাজিশিয়ান হিসেবে নাম কিছুটা ছড়িয়ে পড়ল। আর তখনই আসল নামের সঙ্গে জুড়ে গেল 'রাজা'। রাজা-মহারাজার দেশ হিন্দুস্থান থেকে আসা এই তরুণ জাদুকরের পরিচয়ই যেন নামটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। ওদেশের মানুষের কাছে 'রাজা' এবং 'মহারাজা' - এই দুটি শব্দের মধ্যেই ছিল এক বিশেষ কৌতূহল ও রোমাঞ্চের আবহ। তাই ব্যক্তিগত জীবনের রিপেন বোস ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন জাদুকর 'রাজা বোস' (Rajah Bose)।

এরপর, ইংল্যান্ডে পেশাদারী মঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে ম্যাজিক দেখিয়ে যশ, অর্থ ও নিজের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে কলকাতায় চলে এলেন। সঙ্গে ইংরেজ পত্নী মিস হাইডি ও কয়েকজন ইংরেজ সহকারী। তার পত্নী কাম সহকরিণী হাইডির সঙ্গে শিল্পীর স্বপ্ন (Artist's Dream), ভালুক ও শিকারির খেলাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দর্শকের সামনে ভালুক সাজতেন সুন্দরী হাইডি আর শিকারির ভূমিকায় জাদুকর রাজা বোস। এরপর পরিবর্তন। দেখা যায় ভালুকের জায়গায় রাজা বোস আর শিকারির জায়গায় হাইডি পাল্টাপাল্টি হয়ে গেছে।

২২ মার্চ, ১৯৪৮ কলকাতার রঙমহল রঙ্গমঞ্চে, উইজার্ড ক্লাবে (১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত, একটি জাদুকরদের সংগঠন) তাঁর শেষ প্রদর্শন করেছিলেন জাদুকর রাজা বোস। তাঁর দেখানো সেই আশ্চর্য খেলাটির নাম ছিল 'ব্যারেল ইলিউশন' (Barrel Illusion)।

খেলাটি ছিল এমন - মঞ্চের উপর একটি বড় পিপে রাখা হয়। পিপেটির উপরে ছিল একটি শক্ত ঢাকনা, যা তালা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া যায়। প্রথমে জাদুকরের অনুরোধে কয়েকজন দর্শক মঞ্চে উঠে এসে পিপে, ঢাকনা এবং তালা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখেন। তারা নিশ্চিত হন যে এর মধ্যে কোনো ধরনের গোপন ফাঁকফোকর বা কারসাজি নেই।

এরপর একজন সহকারীকে পিপের ভিতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকনাটি বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। তালার চাবিটি তখন দর্শকদের কাছেই রেখে দেওয়া হয়, যাতে সবাই নিশ্চিত থাকতে পারেন যে কোনো কারসাজি করা সম্ভব নয়। এবার জাদুকর রাজা বোস নিজেকে চাদর দিয়ে ঢেকে, পিপের ওপর বসে পড়লেন। মুহূর্তের মধ্যেই আবার উঠে দাঁড়িয়ে ম্যাজিকের চাদরটি মঞ্চের ওপর ছুড়ে ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গেই সবাই অবাক! কারন তখন আর রাজা বোস নেই - তিনি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন!

এবার সেই দর্শককে ডাকা হলো, যিনি একটু আগেই একটি পিপের তালা বন্ধ করে ছিলেন। তালা খুলে পিপের ঢাকনা তুলতেই দেখা গেল - পিপের ভেতরে বসে আছেন স্বয়ং জাদুকর রাজা বোস! আর সেই সহকারী অদৃশ্য।

জাদুকর পত্নী হাইডি কয়েকবছর পর ইংল্যান্ডে ফিরে যান। কারন নাকি ভারতের আবহাওয়া তাঁর সহ্য হচ্ছিল না। হাইডি চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে রাজা বোস এর দলটি ভেঙে যায়।

শেষ জীবনে কলকাতার স্টার রঙ্গমঞ্চে মঞ্চ-উপদেষ্টা (১৯২৮) ছিলেন। বিভিন্ন নাটকে কিছু কিছু অলৌকিক ঘটনা বা দৃশ্যের পরিকল্পনা করে দিয়ে ছিলেন। গিরিডিতে নিজের বাড়িতে ১৯৪৮ সালে তার প্রয়াণ ঘটে।

(ক্রমশ)

চিত্রঋণঃ শৈলেশ্বর মুখোপাধ্যায় ও কুন্তল খান্না।