
[আত্মজৈবনিক কিছু বলার স্পর্ধা নিয়ে এই পর্ব শুরু। কতটা মনোগ্রাহী হবে জানিনা। অনেকদিন ধরে কিছু ঘটনা নিজের ভেতর ক্রমাগত হাডুডু খেলা শুরু করেছে। অব্যক্ত সত্যি ঘটনা গুলো বলার একটা তাগিদ ভেতর থেকে অনেককাল উথালপাতাল করছে। লিখব লিখব করে লেখা হয়ে ওঠেনি। নিয়মিত কবিতা লেখার ফাঁকে এই লিখন কর্ম আলাদা এক মনোযোগের দাবি করে।সেই দাবি কতটা মেটাতে পারবো জানা নেই। সব থেকে বড় কথা আমার মত অখ্যাত অনামী লোকের পক্ষে কতটা ভালো হবে তাও জানা নেই। আদৌ সাহিত্যের অঙ্গনে এর কোন স্থান হবে কিনা তাও অজানা। "চেষ্টা করতে দোষ কি" এই আপ্তবাক্য মাথায় রেখে নিজস্ব জীবনের কিছু ঘটনা নথিবদ্ধ করার চেষ্টা করেছি।]
।। বাবুলালকাকা ।।
মাঝে মাঝে ভ্রম হয়। সেই ভ্রম নিরসনের কোন শর্টকাট পন্থা জানা নেই। অন্তত নিজের কাছে। কোন পদ্ধতি আয়ত্ত্ব হয়নি। রপ্ত করতে চেয়েও হয়নি। হয়না। বেশ কিছুটা ঝাপসা। সেই ঝাপসা মেঘ কিছুতেই কাটেনা। স্মৃতি এক লাইট হাউস। অনেক দূর থেকে শুধু তার উদ্ভাস নজরে আসে। আবার মুছে যায়। ডুবে যায়। আবার আবছা আলোর উদ্ভাস। ঘুম আর জাগরণের মধ্যে এক বিভ্রাট তৈরি করে। কখনো ভাবি আছে। আবার পরক্ষণে নেই। হামাগুড়ি দিই। সন্তর্পনে। আবার কখনো এই চলন ব্যাহত হয়। প্রায় মধ্যে রাত থেকে একটা চরিত্রকে দেখেছি। আবার ডুবে যাচ্ছি। আবার দেখছি। আবার ঘুমোচ্ছি। তাও পুরো নয়। সবটাই স্থির। সবটাই অচঞ্চল।
অর্ধসুপ্তির যে নাব্যতা তাকে ধরার চেষ্টা করছি। ধরতে পারছি না। সময়ের হাত থেকে পিছলে যাচ্ছে। আসলে লিখতে বসে স্মৃতি বেগোড়বাই করলে আগডুম বাগডুম লেখা হয়ে ওঠে। খেই হারায়। চিন্তার ঘনত্ব না থাকলে ঠিক ঠিক ঘটনার বয়ানও হয় না। লক্ষ্যবস্তুকে, চরিত্রকে ধরতে গিয়ে অধরা থাকলে লেখার স্বাদ মেটে না। লাইট হাউস যেমন আলো দেখায় তেমন। তুমিও লাইট হাউস। এর উপর নজরদারি না করলে অন্য মানচিত্রে ঢুকে পড়বে। খাপছাড়া। পরম্পরাহীন। এত গৌড়চন্দ্রিকা করার উদ্দেশ্য একটাই। মনে মনে জপে উঠি। চরিত্রকে উঠিয়ে আনার চেষ্টা করি। তিনি ভুতোবামুন। ভূতনাথ চ্যাটার্জী। সুযোগ সন্ধানী অস্বচ্ছ এক চরিত্র। দরদালান যা হাকিয়েছে তা পরের সম্পদ হাতিয়ে। অসদউপায়ে। নয় নয় করে দশ - দশটি পোলাপান। একেক জন একেক মাপের। এদের মধ্যে মধ্যম পুত্র সন্তানটি আপেক্ষিক ভালো। আজ সব ঝাপসা অথচ ভিতরটা নড়বড়ে। যেমন করে হোক আস্তে আস্তে অনেক দূরের লাইট হাউসের সতর্ক ছোঁয়া লক্ষ্য করে হাল টানি। এগুলো সময়ের গভীরে শীত ঘূমের আস্তরন। ইচ্ছেমত ডুবে যায়। আবার ভাসে। আবার ডোবে। আবার ভেসে আমাকে ভাসায়।
ভুতোবামুনের বড় ছেলে বাবুলাল কাকা। এতদিন শুধু নামটাই শুনেছি। আজ চাক্ষুষ দেখা। বাবুলাল কাকার পায়ে হাতে মোটা শক্তবেড়ি। শুধু ভেসে ওঠে। সচকিত করে। তার গম্ভীর ধাতব স্বর। সবাই বলেছিল রাঁচির পাগলা গারদ থেকে আজ নিয়ে আসা হচ্ছে। তাকে ঘিরে রেখেছে সবাই। সামনে পিছনে চারজন প্রহরী। সতর্ক নজর দিয়ে আছে। ভুতো বামুনের কে মারা গেছে জানিনা। বউ। বউ হবে হয়তো। তার বউয়ের মৃত্যুর সংবাদে সবাই জড়ো হয়েছে। না তার থেকে বেশি বদ্ধপাগল বাবুলালকে দেখতে। ভুতো ঠাকুরের বড় ছেলে বাবুলাল বদ্ধ উন্মাদ। রাঁচিতে থাকে। মানে রাঁচিতে থাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজ আনা হচ্ছে তার মা'কে এক পলক দেখানোর জন্য। শেষ দেখা দেখাবে। বদ্ধ উন্মাদ বাবুলাল পাগলা। কেন পাগল। কবে থেকে পাগল। এসব কিছুই জানি না। শুধু জানি সত্য এক মোটা লোহার বেড়ি পড়ানো বাবুলাল কাকা। আজ আমাদের সামনে হাজির।
জীপ থেকে নেমে আসছে একটা। হাতে বেড়ি। পায়ে বেড়ি। তার আওয়াজে সারা গ্রাম স্বচকিত। এই ভুতো বামুন তার ছেলেকে রাঁচির উন্মাদ আশ্রম থেকে নিয়ে এসেছে। তার মাকে শেষ দেখা দেখাতে। আচ্ছা পাগলদের কোন দুঃখ থাকে। সে কখন কাঁদে। তা দুঃখে। না প্রিয়জনের কষ্টের। অনেকটা কঙ্কালসার মুখ। ভেবাচেকা। এত লোক দেখে সে চুপচাপ। সে কি বুঝবে তার কে মারা গেছে। সে তার কতটা ছিল। কতটা প্রিয়জন ছিল। যে বিছানায় শুয়ে আছে সে কি মৃত। কতটা মৃত। তার কোন প্রিয়জন ছিল কি ছিলনা সব বিভ্রম। মহা বিভ্রম। সব তলিয়ে যাচ্ছে। বাবুলাল কাকা ও বাবুলাল কাকা - তুমি মা মা বলে ডাকবে না। বলো মা। মা বলো। তুমি চলে যেওনা আমাদের ছেড়ে। উন্মাদ বাবুলাল। মা বলে ডাকে না। কেঁদে ওঠে না। বাবুলালের থেকে তার লোহার বেড়ি যেন কেঁদে উঠছে। ফুলে ফুলে কেঁদে উঠে। তাকে অনেক বেশি ধোঁয়া মনে হচ্ছে। সারা গ্রাম হামলে পড়েছে। এই বাবুলাল কিভাবে একটি মৃত্যুর কাছে তার উন্মাদনা রাখবে। নাকি কোন পুরনো ক্রোধ জাগিয়ে জননীর দিকে এগিয়ে যাবে। ও বাবুলাল - বাবুলাল তোর মা চলে যাচ্ছে! মা বলে ডাক। শেষ ডাক ডাক রে - বাবা -। ভিড়ের মধ্যে থেকে আমার জননীর স্বর ঘুমের মধ্যে আমি শুনতে পাই শুধু।
বাবুলাল - ও বাবুলাল - মা বল - মা বলে একবার শেষ ডাক ডাকরে বাবা -।
চিত্রঋণঃ অন্তর্জাল থেকে প্রাপ্ত।
