বিবিধ

ভাষা এক আশ্চর্য নদীর নাম (মুক্তগদ্য)



মৌসুমী রায়


ভাষার কথা আমরা ভুলেই থাকি সারাবছর। ফেব্রুয়ারি মাসে একবার খুব মনে পড়ে। যেমনটা ১লা বৈশাখে আমরা বাঙালি হই, তেমনটি ফেব্রুয়ারি তে বাংলা ভাষার।

শীতকাল এলে যেমন গরম জামা বের করে রোদে দিই, পরি, তেমন ফেব্রুয়ারির একুশে আমরা অ আ লেখা পোশাক আর ক খ লেখা গয়না পরে আমার ভাইয়ের রক্তে ভেসে যাওয়ার উদযাপন করি। বছর বছর একরকম হলে তো চলে না, তাই নানারকম চমক থাকে। ইদানিং তাতে ভাষা বিরোধের তড়কা মিশছে দেখা যাচ্ছে।

সত্যিই কি ভাষায় ভাষায় কোন বিরোধ আছে? নাকি থাকতে পারে? ভাষা তো মানুষের সৃষ্টি। একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য, ভাব বিনিময়ের জন্যই তো ভাষা। ভাষা নিয়ে বিরোধ মানে তো ভাব বিনিময়ের অভাব। মা কে যে ভাষাতেই ডাকি মা তো মা - ই। তেমন যোগাযোগ করতে চাইলে ভাষা কোন অন্তরায় নয়।

আমরা তো আজকাল যোগাযোগ রাখাই ছেড়ে দিয়েছি। তার বদলে ভাষা নিয়ে মাতামাতি বাড়িয়েছি।

'শরীরের যত্ন নিও' থেকে 'tc' (take care-এর WhatsApp version)-তে এসে পৌঁছেছি।

আমরা আমাদের অভ্যাস বদলেছি, মাধ্যম বদলেছি। ভাষা কিন্তু তার গতিপথ ঠিক করে নিয়েছে। ভাষা আসলেই এক আশ্চর্য নদীর নাম। কভারেজ থেকে ভাসতে ভাসতে কখন কবিরাজি হয়ে গেছে আমরা জানতেই পারিনি। দরজা আর জানালা যে দুই দেশের ভাষা থেকে এসে আমার ঘরে এঁটে বসেছে, তা আর পুলিশ ডেকেও আর বার করার উপায় নেই। রেস্তোরাঁয় খাওয়ার কুপন নিতে লটারি জেতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় মনেই থাকে না যে ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের ভেতর কি প্রবল বিরোধ ছিল। ভাষা নিয়ে রক্ত স্নাত আন্দোলন থেকে শুরু করে নতুন দেশ তৈরি হওয়ার পরও সে দেশের মানুষ জলকে পানি বলতে পারেন অনায়াসে। এতে আশ্চর্য হওয়ার মত কিছু দেখি না। আসলে একটা যুদ্ধ চলে বাইরে আর অন্যটা ভেতরে। একটা যুদ্ধ আমাদের দূরে ঠেলে দেয়, অন্যটা কাছে টানে। ভাষা হল সেই অন্তসলিলা, যে আমাদের কাছে টানে, ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয়। অসহ্য নীরবতা আর অবর্ণনীয় একাকীত্বের অবসান হয় ভাষার হাত ধরে। যে ভাষাই হোক না কেনো, আমাদের উচিত ভাষাকে ভালোবাসা। তাকে অন্তরে জায়গা দেওয়া।

ভাষার মাধুর্য আমাদের মুগ্ধ করুক। শালীনতা বজায় থাকুক। আমার ভাষা সেরা বলে অন্য ভাষাকে আক্রমণের প্রয়োজন না হওয়াই ভালো। প্রতিযোগিতা হোক সুস্থ। আলোচনা হোক বছর ভোর। প্রতি মুহূর্তের মনোযোগ এবং ভালোবাসা দরকার ভাষার। একদিনের উদযাপন নয়। ভাষা আমাদের যাপনের অঙ্গ হোক। এই নদীতে আমরা অবগাহন করি। তাই তার আঙিনা হোক সমস্ত রকম কলুষমুক্ত। ভাষা এক আশ্চর্য নদী। তার যত্ন নিতে হবে শ্বাস নেওয়ার মত।