একটি প্রবচনে আছে: "সমস্ত ধর্মের উদ্দেশ্য ভগবানকে ভালোবাসা।" আপনিও ভগবানকে বিভিন্নভাবে ভালবাসতে পারেন এবং হৃদয় সিংহাসনে বসাতে পারেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন - "কলিকালে যদি কেউ মহামন্ত্র কীর্তন করেন ভগবান তাতে বেশি খুশি হন।"
'চৈতন্যচরিতামৃত'র মধ্যে কলিকালে নামরুপী কৃষ্ণ অবতার মহাপ্রভু বলেছেন -
"প্রভু কহে, - 'যে করিতে করিবা তুমি মন।
কৃষ্ণ সেই সেই তোমা করাবে স্ফুরণ॥' "
বাল্যকাল থেকে ভগবানের স্বর্গীয় অপরূপ ও মধুর দৃশ্য দেখলে পৃথিবীর আর যেকোনো ঐশ্বর্য ও মাধুর্য সব যেন ফিকে ও পানসে মনে হয়। তাই সুপ্রাচীন কাল থেকে হিন্দুর বাড়ির ঠাকুরঘরে তাঁরই মূর্তি শোভা ও পূজা পেয়ে আসছে। তার সেসব লীলায় ঐশ্বর্য ভাব প্রকৃত হয়েছিল সেগুলি হল রাক্ষস-রাক্ষসী বধ, কালিয়া দমন, জরাসন্ধ-শিশুপাল বধ, গোবর্ধন পর্বত ধারণ ইত্যাদি। আবার মধুর ভাব দেখা যায় মা যশোদার সঙ্গে, স্নেহ ও ভালোবাসা, মান অভিমানের খেলা, শ্রীদাম-সুদাম-বসুদাম-এর সঙ্গে সখ্যভাবে লীলা এবং বৃন্দাবনে গোপীদের সঙ্গে অপার্থিব লীলা।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলা এমন মধুর যে, যেকোনো লীলা শ্রবণ করলেই আমাদের আনন্দের সমুদ্রে নিমজ্জিত করে। এমনই একটি লীলা: একদিন নন্দ মহারাজ খেতে বসেছেন। ডান দিকে বলাই ও বাম দিকে কানায় বসেছেন। নন্দ মহারাজ কানাইয়ের গালি মাঝে মাঝে চুমো দিচ্ছেন। নন্দরানী বললেন, "আজ অনেক মেয়েরা নালিশ করে গেছে - তোমাদের কানাই যমুনা নদীর জলে দাঁড়িয়ে উপরের জল ছিটিয়ে পিচ্ছিল করে দিয়েছে - যাতে আমরা পড়ে যাই।"
নন্দ মহারাজ বললেন - "সত্যি! কানাই তুমি এইরকম কেন করেছো? মা-বাবা, ওনারা আমায় দেখার জন্য এইসব অজুহাত নিয়ে বাড়িতে আসে।"
"ও! তাই নাকি! তোমাকে দেখার জন্য আসে।" এই কথা শোনামাত্রই নন্দ মহারাজ, যশোদা রানী, রোহিনি সকলেই হাসতে লাগলেন।
তিনি যে সর্বব্যাপী, অখণ্ড সচ্চিনন্দ, সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্তা আবার প্রেমের আকর্ষণে মানব শিশু হয়ে লীলা করেছেন তারই একটি ঘটনা উল্লেখ করা হচ্ছে। একদিন মা যশোদার কাছে নালিশ এসেছে - "দেখ, দেখ, কৃষ্ণ মাটি খেয়েছে; এই ধরে নিয়ে এসেছি।"
শ্রীদাম-সুদাম-বসুদামের কথা শুনে মা আঁতকে উঠলেন: "কিরে, খুব দুষ্টু হয়েছিস! মাটি খেলি কেন? মাটি কি একটি খাবার জিনিস?"
কৃষ্ণ ছলছল চোখে ডাগর ডাগর আঁখি দুটি মেলে ভয় উদ্বেগ ও আশঙ্কা মেশানো গলায় বলে উঠলেন - "মা, আমি মাটি খাই নি, এরা সবাই মিথ্যা বলছে। ঠিক আছে, তুমি এদের সামনে আমার মুখ দেখলে বুঝতে পারবে যে আমি কত সত্যবাদী।"
মা কৃষ্ণের কৃষ্ণের স্বাস্থ্যের কথা ভেবে বলে উঠলেন - " মুখ খোলো, হাঁ করো।"
কৃষ্ণ হাঁ করলেন - কি দেখলেন মা যশোদা? কৃষ্ণের মুখের মধ্যে গোটা ব্রহ্মাণ্ড। মা ভয় পেয়ে গেলেন - একি! কৃষ্ণের মুখে এসব কি দেখলাম।
আবার এক জায়গায় পেয়ে থাকি, কোনো কারনে মা ভাবলেন আজ কৃষ্ণকে শাস্তি দিতে হবে। এই ভেবে ভগবানকে যশোদা মানব শিশুর মত ভাবলেন। এই শাস্তির সম্বন্ধে শুকদেব লিখলেন - "যার ভিতরেও নাই, বাহিরও নাই, যার পূর্বে কেউ ছিলনা পরেও কেউ থাকবে না অর্থাৎ যিনি জগতের অন্তরে ও বাহিরে এবং সৃষ্টির পূর্বে ও এবং ধ্বংসের পরেও বিদ্যমান থাকেন, এমনকি এই জগতে যার স্বরূপ থেকে আলাদা নয়। সেই পরমব্রহ্ম-স্বরূপকেই বাৎসল্যপ্রেমময়ী যশোদাকে বাঁধবেন বলে ঠিক করলেন।"
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কতই না লীলা ছিল, সাধারণ মানুষের তা ব্যাখ্যা করা ও বিশ্লেষণ করা সত্যি খুব কঠিন কাজ। তাই রাধা-কৃষ্ণের যুগলভাব নিয়ে গঠিত তনু শ্রীচৈতন্যদেব, ও 'বৃহন্নারদীয় পুরাণ'-এ একটি শ্লোক প্রায় উল্লেখ করে বলতেন: "হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্ কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা।"
